আইসোলেশনের হদিস নেই ৯৩ ভাগ করোনা রোগীর

0
546

বছর ঘুরে আবারও মরণকামড় বসিয়েছে করোনাভাইরাস। হু হু করে বাড়ছে সংক্রমণ হার ও মৃত্যু। অথচ, শনাক্ত হওয়া ৯০ শতাংশের বেশি রোগীরই আইসোলেশন নিশ্চিত হচ্ছে না। এই রোগীগুলো স্বাস্থ্যবিধি  ছাড়াই বাইরে ঘোরাফেরা করে সংক্রমণ ছড়াচ্ছে কি না তা জানা নেই কারও।

দেশে দ্রুত সংক্রমণ বৃদ্ধির জন্য এটা অন্যতম একটা কারণ হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। স্বাস্থ্য অধিদফতরের তথ্যানুযায়ী, গতকাল সকাল ৮টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় দেশে নতুন করে ৫ হাজার ৪২ জনের দেহে করোনা সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে। মৃত্যু হয়েছে ৪৫ জনের। এই সময়ে নতুন করে আইসোলেশনে গেছেন মাত্র ৩৫৭ জন, যা শনাক্ত রোগীর মাত্র ৭ শতাংশ। বাকি ৯৩ শতাংশ রোগীর আইসোলেশনের কোনো খবর নেই। এর আগের দিন ৫ হাজার ১৮১ জন নতুন রোগী শনাক্ত হয়। এটাই ছিল গতকাল পর্যন্ত দেশে এক দিনে সর্বোচ্চ রোগী শনাক্তের খবর। ওই দিন আইসোলেশনে যান ৩৬৮ জন, যা শনাক্ত রোগীর মাত্র ৭ দশমিক ১০ শতাংশ। এদিকে সুস্থ ও মৃত্যু বাদে গতকাল সকাল পর্যন্ত দেশে মোট সক্রিয় করোনা রোগীর সংখ্যা ছিল ৫৬ হাজার ৭৬৩ জন। এর মধ্যে হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন ৪ হাজার ১২০ জন। আইসোলেশনে ছিলেন ১১ হাজার ৪৩৯ জন। বাকি ৪১ হাজার ২০৪ জন করোনা রোগী কোথায় কীভাবে আছে, সেই তথ্য নেই স্বাস্থ্য অধিদফতরে।

গতকাল পরিচিত কয়েকজন কভিড-১৯ পজেটিভ রোগীর সঙ্গে  ফোনে কথা বলে জানা যায়, রিপোর্ট নেগেটিভ না আসলেও শারীরিকভাবে সুস্থ বোধ করায় তারা সব জায়গাতেই যাচ্ছেন। একজন ফোনে জানান, জরুরি কিছু কাজ থাকায় সেগুনবাগিচা যাচ্ছেন। গত ২০ মার্চ করোনা শনাক্ত হয় তার। পরবর্তী নমুনা পরীক্ষার তারিখ ৬ মার্চ। তবে নিজেকে পুরোপুরি সুস্থ মনে করায় গত তিন-চার দিন ধরে স্বাভাবিক চলাফেরাই করছেন। এ ব্যাপারে স্বাস্থ্য অধিদফতরের এমআইএস শাখার মিডিয়া সেলের মুখপাত্রের নম্বরে ফোন করলে সেখান থেকে বলা হয়, অধিকাংশ রোগী বাড়িতে থেকে চিকিৎসা নেওয়ায় সবার আইসোলেশনের তথ্য নেই। তবে কারও সংক্রমণ শনাক্ত হলে তাকে ফোন করা হয়। অনেক সময় ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। এ ব্যাপারে রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. মুশতাক  হোসেন বলেন, সংক্রমণ উৎস থেকে বন্ধ করতে রোগীদের আইসোলেশন এবং বিদেশফেরত বা করোনা রোগীর সংস্পর্শে যারা গেছেন তাদের কোয়ারেন্টাইন নিশ্চিত করা জরুরি। কিন্তু, শনাক্ত রোগীরা কোথায় কীভাবে আছে সে তথ্য না থাকা স্বাস্থ্য অধিদফতরের অনেক বড় দুর্বলতা। আমার জানা মতে, সব রোগীকে আইইডিসিআর ও স্বাস্থ্য অধিদফতরের কন্ট্রোল রুম থেকে ফোন করা হয়। ফোনে যাদের আইসোলেশনের তথ্য পায়, তাদেরটা লিপিবদ্ধ করা হয়। অনেকে আইসোলেশনের ভয়ে ফোন বন্ধ রাখে। এ কারণেই রোগীর চেয়ে আইসোলেশনের তথ্য কম। ওই রোগীগুলোকে ঠিকানা ধরে খুঁজে বের করে আইসোলেশন নিশ্চিত করা জরুরি। না হলে পরিস্থিতি ভয়াবহ হবে। রোগী যত বাড়বে, আইসোলেশন তত চ্যালেঞ্জিং হবে। কন্ট্রোল রুমের জনবল বাড়াতে হবে। শনাক্তের পর ফোন করতে সাত দিন পার হয়ে গেলে লাভ হবে না। এমনিতে অনেক করোনা রোগী পরীক্ষাই করছেন না। তাই সবাইকে মাস্ক পরতে হবে।

সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে আনতে স্বাস্থ্যবিধি জরুরি, তবে সবচেয়ে জরুরি রোগীর আইসোলেশন নিশ্চিতের মাধ্যমে উৎস বন্ধ করা। এই খাতে জনবল ও খরচ বাড়ালে হাসপাতাল ও আইসিইউর পেছনে সরকারের খরচ কমে যাবে। স্বাস্থ্যবিধিতে উদাসীনতা ও দেশে করোনাভাইরাসের অধিক সংক্রমণশীল ভেরিয়েন্ট ছড়িয়ে পড়ায় সংক্রমণ বাড়ছে। তাই সব রোগীর কক্ট্রাক্ট ট্রেসিং খুবই জরুরি। এদিকে সংক্রমণের পাশাপাশি বাড়ছে মৃত্যু। গত দুই দিনই ৪৫ জন করে মারা গেছেন করোনা সংক্রমণে। দেশে মোট মৃত্যু ৯ হাজার ছুঁই ছুঁই করছে। গতকাল পর্যন্ত দেশে মোট শনাক্ত করোনা রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৫ হাজার ৯৩৭ জনে। এর মধ্যে সুস্থ হয়ে উঠেছেন ৫ লাখ ৪০ হাজার ১৮০ জন। মৃত্যু হয়েছে ৮ হাজার ৯৯৪ জনের। গত বছর মার্চে দেশে করোনা সংক্রমণ শুরুর পর প্রতিটা রোগীর বাড়ি পর্যন্ত নজরদারিতে আনা হয়। টাঙিয়ে দেওয়া হয় লাল পতাকা। নিশ্চিত করা হয় আইসোলেশন ও কোয়ারেন্টাইন। স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিত করতে প্রচারণার পাশাপাশি মাঠে নামে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। নানা পদক্ষেপের কারণে ডিসেম্বরে শীতের মধ্যেও কমে আসে সংক্রমণ। ফেব্রুয়ারিতে সংক্রমণ হার ৩ শতাংশের নিচে নেমে আসে। কিন্তু, মার্চ থেকে ফের বাড়তে শুরু করে সংক্রমণ। গত ২৪ ঘণ্টার নমুনা পরীক্ষায় সংক্রমণ হার ছিল ১৮ দশমিক ৯৪ শতাংশ।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে