চোখের পাতা কাঁপা: প্রতিকার

0
655

ধুলোবালিযুক্ত বাতাস, ঠান্ডা বাতাস এ মুহূর্তগুলোতে পরিবেশের কারণে চোখের পাতা কাঁপতে পারে। একবার শুরু হলে অনেকক্ষণ পর্যন্ত এটি থাকতে পারে। শারীরিকভাবে চোখের পাতার ভিতরের অংশে কোনো ইরিটেশন তৈরি হলে এমন কাঁপে

চোখের পাতা কাঁপা নিয়ে কিছু প্রবাদ আছে। হাত চুলকালে যেমন টাকা আসে, তেমনি কুসংস্কারবশত লোকে বলে, চোখের পাতা কাঁপলে বিপদ আসে। শুধু চোখের পাতা নয়, বাহু, মুখের যে কোনো অংশ, চোখের কোণ, পিঠে, ঘাড়ে, শরীরের অনেক জায়গাতেই এভাবে কোনো কারণ ছাড়াই হঠাৎ হঠাৎ কিছু অংশ কাঁপে। এসব সার্বিকভাবে হয় মূলত সেই অংশের কিছু পেশির অনৈচ্ছিক সংকোচনের কারণে। তাহলে চোখের পাতা কাঁপে কেন। চোখের পাতা কাঁপা শরীরের কোনো আবশ্যক কাজের একটি নয়। এটি মূলত একটি অনৈচ্ছিক পেশি সংকোচন। মানে হলো- শরীরের যে পেশিগুলো নড়াচড়ায় শরীরের কোনো হাত থাকে না। এটি হবে কি হবে না অথবা এটিকে থামিয়ে দিতে আপনার ইচ্ছা অনিচ্ছার কোনো দাম নেই। এটি শুরু হয় যে কারণবশত সেটি চলে না যাওয়া  পর্যন্ত চাইলেও সেটিকে আপনি থামাতে পারবেন না। চোখের উপরে এবং নিচে চোখকে ঢেকে রাখার জন্য যে চামড়ার ভাঁজ থাকে, তাকে বলে eye lid বা চোখের পাতা। বিশেষ করে চোখের উপরের পাতা মাঝে মাঝে কাঁপে। এই কাঁপা কয়েক সেকেন্ড থেকে কয়েক মিনিট, কয়েক মিনিট থেকে কয়েক ঘণ্টা, এমনকি কয়েক ঘণ্টা থেকে কয়েক সপ্তাহ পর্যন্ত থাকতে পারে। এটি কখনো কখনো থেকে থেকে একটু পর পর আসে, চোখের আশপাশের কোনো একটি অংশ টিকটিক করে, চোখের উপরে চামড়ার কোনো একটি অংশ পিটপিট করে। সহজ ভাষায় একে বলে Eye Twitching। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় বলে Blepharospasm। এটি কখনো কখনো এক চোখে হয়, কখনো কখনো দুই চোখেই হতে পারে, কখনো কখনো মুখের একটি অংশজুড়ে শুরু হয়, তখন মুখের একটি অংশসহ সেই অংশের চোখের পাতা এমন blink করতে পারে। যখন মুখের একটি অংশ এমন করে spasm হয়, চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় তাকে বলে hemifacial spasm।

যা হোক বলছিলাম, চোখের পাতা কাঁপা নিয়ে। তবে এটি কেন হয়। এটি হওয়ার পিছনে অনেকগুলো কারণকে দায়ী করা হয়। সব কারণকে তিন ভাগে ভাগ করা যায়। শারীরিক, মানসিক, স্নায়বিক। সবচেয়ে বেশি যে কারণে এটি হয় বলে চিকিৎসকরা ধারণা করেন, তা হলো-  tiredness বা ক্লান্তি। চোখের কোনো অংশ যখন এমন কাঁপবে, ধরে নেবেন আপনি মানসিকভাবে কোথাও উদ্বিগ্ন, আপনার বিগত ক’দিন কোনো না কোনোভাবে কম ঘুম হয়েছে। যারা বেশি পরিমাণ ধূমপান করে, ঘন ঘন অ্যালকোহল পান করে, এমনকি দেখা গেছে, খুব বেশি পরিমাণ কফি পান করলে চোখের পাতা এমন ঘন ঘন কাঁপতে পারে। ক্যাফেইনের মাত্রা যদি শরীরে বিষাক্ত মাত্রায় চলে যায়, দেখা গেছে চোখের পাতা তীব্রভাবে কাঁপতে থাকে। এরপর আসে কিছু পরিস্থিতিতে এটি কাঁপতে পারে। যেমন তীব্র আলো, ধোঁয়া, ধুলোবালি যুক্ত বাতাস, ঠান্ডা বাতাস এ মুহূর্তগুলোতে পরিবেশের কারণে চোখের পাতা কাঁপতে পারে। একবার শুরু হলে অনেকক্ষণ পর্যন্ত এটি থাকতে পারে। শারীরিকভাবে চোখের পাতার ভিতরের অংশে কোনো ইরিটেশন তৈরি হলে এমন কাঁপে। সঙ্গে এটি যদি দীর্ঘ একটি সময়ে একনাগাড়ে থাকে, দৃষ্টিশক্তিকে কোনোভাবে প্রভাবিত করে অথবা শরীরে সংশ্লিষ্ট আরও কিছু সমস্যা থাকে, তখন এমন চোখের পাতা বারবার কাঁপুনির পিছনে কিছু কারণ থাকে। যেমন পারকিনসন ডিজিজ, ব্রেইন টিউমার, এপিলেপসি। কোনো কারণে অথবা দীর্ঘ সময় ফোনে কিংবা কম্পিউটার স্ক্রিনে চোখ ব্যস্ত থাকলে চোখের ড্রাইনেস সমস্যা দেখা দেয়। শারীরিক, মানসিক এবং পরিবেশগত এই কারণগুলো ছাড়াও দেখা গেছে যে, কখনো কখনো কিছু মেডিসিনের কারণেও এমন টুইচিং করতে পারে। সব কারণের বাইরে আরও কিছু স্নায়বিক সমস্যা কিংবা রোগের সঙ্গে উপসর্গ হিসেবেও এটি দেখা যায়। সেক্ষেত্রে সেই রোগগুলোর লক্ষণ উপসর্গ তীব্রভাবে থাকতে হয়। যেমন : bell’s palsy, dzstonia।

দিনের কিছু সময়, কিছুদিন পর পর এটা ফিরে এলে নিজে নিজেই আবার চলে যাবে। উদ্বিগ্ন হওয়ার কারণ নেই। কিন্তু যদি এমন অবস্থা একনাগাড়ে দুই সপ্তাহের বেশি থাকে, চোখের আশপাশে কোনোভাবে ব্যথা করে, চোখ দিয়ে অযথা পানি পড়তে থাকে, দেখায় কোনোভাবে সমস্যা হয়, চোখের উপরে বা নিচে ফুলে যায়, এমন পরিস্থিতিতে চিকিৎসকের কাছে যান, চক্ষু বিশেষজ্ঞের শরণাপন্ন হবেন। কোনোভাবেই ব্যাপারটিকে অবহেলা করবেন না। চোখের পাতা কাঁপা তখন যত সমস্যা নয়, চোখ অথবা শরীরের অন্য কোথাও সমস্যা বাসা বেঁধেছে বলে তারই একটি প্রকার হিসেবে কাঁপুনি দেখা দিয়েছে দীর্ঘ সময়। উপরেই বলেছি, এমন এলে উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই। চিকিৎসা করার কিছু নেই। নিজে নিজে চলে যাবে, আবার আসতেও পারে। তবে এটি যদি শরীরে কোনো সমস্যার কারণে হয়ে থাকে, সমস্যা চিহ্নিতকরণ করে তার ট্রিটমেন্ট করতে হবে। যেমন ড্রাই আই হলে চোখে কৃত্রিম অশ্রু জল দিয়ে চোখটাকে ভিজিয়ে রাখতে হবে। কোনো কারণ ছাড়াই বারবার ফিরে এলে এবং চোখে আশপাশে কোনো সমস্যা তৈরি করলে চিকিৎসকরা যে ট্রিটমেন্ট সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করে তা হলো- Botox ইনজেকশন। যে অংশে এমন কাঁপুনি বারবার হয়, সেখানে বটুলিনাম টক্সিন নামের ইনজেকশন দিয়ে তা থামানো হয়।

এর বাইরে তাৎক্ষণিক স্বল্প সময়ের জন্য সমস্যা থেকে বের হয়ে আসছে চিকিৎসকরা ক্লোনাজিপাম জাতীয় এন্টি এপিলেপটিক মেডিসিন অথবা লোরাজিপাম জাতীয় ওষুধ দিয়ে থাকেন। ইনজেকশন, মেডিসিন কাজ না হলে, শেষ অপশন হিসেবে myectomy অপারেশন করে সমস্যাটি দূর করা যায়।

উদ্বিগ্নমুক্ত জীবনযাপন করার চেষ্টা করুন, ক্লান্তি এলে শরীরকে বিশ্রাম দিন, পর্যাপ্ত ঘুমান, ভিটামিন অসমৃদ্ধ খাবার খান, পরিমাণের চেয়ে বেশি চা কফি খাবেন না,  ধূমপান ছাড়ার চেষ্টা করুন, যারা চোখে মেকআপ করেন, ঘুমের আগে ভালো করে পরিষ্কার করে নিন, কন্টাক্ট লেন্স ব্যবহার করলে চোখ সুরক্ষার নিয়মগুলো মেনে চলুন।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে