নিবন্ধন ছাড়াই চলছে নর্দান মেডিকেল

0
744

ওটি, আইসিইউ, রোগী ও চিকিৎসক ছাড়াই চলছে হাসপাতাল * নেই শিক্ষক ও বিভাগ * বিশেষ বিবেচনায় এমবিবিএস পাশ শিক্ষার্থীদের ইন্টার্নের ব্যবস্থা করা হবে -মহাপরিচালক

শিক্ষার্থী আছে, শিক্ষক নেই; হাসপাতাল আছে, চিকিৎসক ও রোগী নেই। এমনকি অপারেশন থিয়েটার, আইসিইউ (ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিট), সিসিইউ (করোনারি কেয়ার ইউনিট) নেই। নামমাত্র বিভাগ থাকলেও কোনো বিভাগেরই নেই বিভাগীয় প্রধান, অধ্যাপক, সহকারী-সহযোগী অধ্যাপক ও রেজিস্ট্রার। এমনকি বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিলের (বিএমডিসি) নিবন্ধন পর্যন্ত নেই। তবুও প্রতারণার মাধ্যমে প্রতিবছর শিক্ষার্থী ভর্তি করছে রংপুরের নর্দান প্রাইভেট মেডিকেল কলেজ। এতে বিপর্যয়ের মুখে পড়ছে একদল মেধাবী শিক্ষার্থীর জীবন।

মঙ্গলবার কলেজের ভুক্তভোগী ১৫ জনের বেশি শিক্ষার্থী এসব অভিযোগ জানান। তারা বলেন, কলেজের ২০১৪-১৫ শিক্ষাবর্ষ থেকে ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষ পর্যন্ত ২২২ জন শিক্ষার্থী ভর্তি হয়েছে। এর মধ্যে ২০১৪-১৫ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী ছাড়া অন্য কারও নিবন্ধন নেই। ফলে অন্যান্য বর্ষের শিক্ষার্থীরা প্রফেশনাল পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে পারছেন না। কলেজ বা হাসপাতালে কখনো মন্ত্রণালয় বা অধিদপ্তর থেকে পরিদর্শনে গেলে আশপাশের হাসপাতাল থেকে রোগী, চিকিৎসক ও অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া করে এনে দেখানো হয়।

এসব বিষয়ে জানতে চাইলে স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. এএইচএম এনায়েত হোসেন বলেন, কলেজটি দীর্ঘদিন তাদের নিবন্ধন নবায়ন করেনি। এমনকি কলেজ পরিচালনার ক্ষেত্রে মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের নিয়মনীতিও ঠিকমতো মানছে না। কিন্তু উচ্চ আদালতের আদেশের বলে তারা প্রতিবছর শিক্ষার্থী ভর্তি করছে। ফলে অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। তিনি বলেন, ইতোমধ্যে কলেজের ২০১৪-১৫ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থীরা এমবিবিএস পরীক্ষায় পাশ করেছে। কিন্তু তারা বিএমডিসির নিবন্ধন নবায়ন না করায় সমস্যায় পড়েছেন। তবে বিশেষ বিবেচনায় এসব শিক্ষার্থীর ইন্টার্নের ব্যবস্থা করা হবে বলে জানান তিনি।

নর্দান প্রাইভেট মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থী মো. আশরাফুল ইসলাম, মো. শিহাব আহমেদ ও মো. আলমগীর কবীর বলেন, ২০০০ সালে এই মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠা করা হয়। কিন্তু মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের কোনো শর্ত পূরণ না করায় ২০০৪ সালে কলেজটির কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়া হয়। তারপর কলেজ কর্তৃপক্ষ উচ্চ আদালতের নির্দেশনা নিয়ে শিক্ষার্থী ভর্তি শুরু করে। তবে এ পর্যন্ত বিএমডিসির অনুমোদন নেয়নি। ২০১৫-১৬ শিক্ষাবর্ষে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তর্ভুক্ত প্রতিষ্ঠান হিসাবে নিবন্ধিত থাকলেও পরে সেটিও তারা নবায়ন করেনি। শিক্ষার্থীরা জানান, এই প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন শিক্ষাবর্ষে যারা ভর্তি হয়েছেন, তাদের কাছ থেকে মন্ত্রণালয় নির্ধারিত ফির চেয়ে অনেক বেশি টাকা আদায় করা হয়। ভর্তির ক্ষেত্রে ১৫ থেকে ২০ লাখ টাকা, মাসিক বেতন ৮ থেকে ১০ হাজার টাকা নেওয়া হচ্ছে। এমনকি গরিব ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের বিনা মূল্যে শিক্ষার কোটা থাকলেও তাদের কাছ থেকে ১০ থেকে ১২ লাখ টাকা আদায় করা হতো। কিন্তু তাদের সরকার নির্ধারিত ফির (৬৫০০ টাকা) রসিদ দেওয়া হয়। শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন সময় বিএমডিসির নিবন্ধনের দাবি জানিয়ে এলে একপর্যায়ে একটি জাল সনদ দেখিয়ে তাদের শান্ত করে কর্তৃপক্ষ।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, হাসপাতালের অবকাঠামো ছাড়া আর কিছুই না থাকায় ২০২০ সালের অক্টোবরে রংপুরের সিভিল সার্জন হাসপাতাল কর্যক্রম বন্ধ করে দিয়ে আসেন। মেডিকেল কলেজ সংযুক্ত হাসপাতাল হলেও সেখানে নেই কোনো জরুরি বিভাগ। এমনকি মেডিসিন, সার্জারি বা অন্য কোনো বিভাগও নেই। সেখানে নেই কোনো প্যাথলজিক্যাল ল্যাব, টেকনোলজিস্ট ও টেকনিশিয়ান। নেই কোনো অপারেশন থিয়েটার। কলেজে একজন অধ্যক্ষ থাকলেও নেই কোনো চিকিৎসক। কলেজের মেডিসিন বিভাগের কোনো শিক্ষক নেই, সার্জারি বিভাগে একজন সহকারী অধ্যাপক। ফরেনসিক ও কমিউনিটি মেডিসিন বিভাগে দুজন অধ্যাপক থাকলেও বয়সের ভারে তারা ন্যুব্জ। অন্যান্য বিভাগ বলে কিছু নেই। কলেজে আগে পরীক্ষার কেন্দ্র থাকলেও সেটিও বাতিল হয়ে গেছে। ছাত্রছাত্রীদের জন্য নেই কোনো হোস্টেল। এমনকি হাসপাতালের নিজস্ব কোনো অ্যাম্বুলেন্সও নেই।

এসব বিষয়ে জানতে চাইলে নর্দান প্রাইভেট মেডিকেল কলেজের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান রোকেয়া লাভলি বলেন, আমাদের কাগজপত্রে কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু অধিদপ্তর বা মন্ত্রণালয় নিবন্ধন না দিলে আমরা কী করব। তিনি জানান, সরকার নির্ধারিত ফির চেয়েও কম টাকায় তিনি শিক্ষার্থী ভর্তি করেন। সেই টাকাও তারা দেয় কিস্তিতে। এমনকি অনেক শিক্ষার্থী টাকা না দিয়েই পাশ করে চলে যায়। শিক্ষক না থাকার বিষয়ে তিনি বলেন, শিক্ষক না থাকলে ছাত্ররা পাশ করে কীভাবে। তার কলেজের সব ছাত্রই বিসিএস-এর মাধ্যমে সরকারি চাকরি পায়, বিএসএমএমইউতে এমএস, এমডিতে ভর্তির সুযোগ পায়। আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা যেসব অভিযোগ করেছে, সবই মিথ্যা বলে জানান তিনি।

এর আগে রোববার মধ্য রাতে আন্দোলনরত ৩২ শিক্ষার্থীকে ভাড়া করা হোস্টেল থেকে বের করে দেওয়া হয়। পরে পুলিশের হস্তক্ষেপে তাদের মেসে উঠিয়ে দেওয়া হয়। আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা তাদের চিকিৎসক হওয়ার ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।

সামগ্রিক বিষয়ে বিএমডিসির সদস্য অধ্যাপক ডা. শারফুদ্দিন আহমেদ বলেন, এ ধরনের মেডিকেল কলেজগুলো মন্ত্রণালয় ও বিশ্ববিদ্যালয় থেকে নিবন্ধন নেয়; কিন্তু বিএমডিসির নিবন্ধন নিতে পারে না। কারণ সব নিয়মনীতি না মানায় তাদের নিবন্ধন দেওয়া হয় না। তিনি বলেন, এ ধরনের প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে একটি পূর্ণাঙ্গ টিম করে (বিএমডিসি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সমন্বয়ে) পরিদর্শন করতে হবে। নিয়ম না মানলে প্রয়োজনে প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দিতে হবে। কিন্তু মেধাবী শিক্ষার্থীদের জীবন নিয়ে কাউকে ছিনিমিনি করতে দেওয়া যাবে না।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের প্রতিবাদ : মঙ্গলবার ‘নর্দান মেডিকেলের প্রতারণা : স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের শিক্ষা সচিবকে ঘেরাও, বিক্ষোভ’ শিরোনামে প্রকাশিত সংবাদের প্রতিবাদ জানিয়েছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র তথ্য কর্মকর্তা মো. মাইদুল ইসলাম প্রধান স্বাক্ষরিত প্রতিবাদপত্রে মঙ্গলবার বলা হয়েছে, প্রকৃতপক্ষে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব মো. আলী নূর বর্ণিত সময়ে সচিবালয়ে তার নিজ কার্যালয়ে দাপ্তরিক কাজ করছিলেন। তিনি রংপুরে ঘটনাস্থলে ছিলেন না।

রংপুর ব্যুরোর বক্তব্য : প্রকাশিত সংবাদে ডা. এএইচএম এনায়েত হোসেনের পদবি ভুলক্রমে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের শিক্ষা সচিব লেখা হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে তিনি স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক। অনিচ্ছাকৃত এ ভুলের জন্য আমরা দুঃখিত।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে