ব্রেস্ট ফিডিং: সুস্বাস্থ্যের জন্য আজীবনের বিনিয়োগ

0
76

হাজারো স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে চলমান বর্তমান এ বিশ্বে ব্যক্তি এবং সমাজের দীর্ঘস্থায়ী কল্যাণে ব্রেস্ট ফিডিং একটি সহজ কিন্তু শক্তিশালী সমাধান হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ২০২৩ সালের হিসেব মতে- বাংলাদেশের আঙ্গিকে একটি স্বাস্থ্যকর সমাজ গড়ে তুলতে ব্রেস্ট ফিডিংয়ের প্রচার ও প্রসার অপরিহার্য। মূলত, ব্রেস্ট ফিডিংয়ের পেছনের উপকারিতাগুলো একটি শিশুর শৈশবকালের বাইরেও প্রসারিত।

২০২৩ সালে বাংলাদেশে স্তন্যপানের হার উন্নতিতে বেশ কিছু সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়েছে। বাংলাদেশ ডেমোগ্রাফিক অ্যান্ড হেলথ সার্ভে (বিডিএইচএস) এর সাম্প্রতিক তথ্য অনুসারে- যেখানে ছয় মাসের কম বয়সী শিশুদের জন্য বুকের দুধ খাওয়ানোর হার সর্বোত্তম থাকে, সেখানে মাত্র ৩৫.৯ শতাংশ শিশুকে বুকের দুধ খাওয়ানো হচ্ছে। এছাড়াও জন্মের পর প্রথম ঘণ্টার মধ্যে বুকের দুধ খাওয়ানোর হার মাত্র ৩৬ শতাংশ।

স্তন্যপানের মাধ্যমে মা ও শিশু উভয়ের স্বাস্থ্যেই তাৎক্ষণিক এবং দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব পরিগণিত হয়। তাৎক্ষণিক সুবিধার মধ্যে মায়ের বুকের দুধ একটি পূর্ণাঙ্গ ও সহজে হজমযোগ্য পুষ্টির উৎস, যা শিশুদের রোগ সংক্রমণ, ডায়রিয়া ও শ্বাসযন্ত্রের অসুস্থতা থেকে রক্ষা করে। দীর্ঘমেয়াদী সুবিধার মধ্যে রয়েছে- স্থূলতা, টাইপ-২ ডায়াবেটিস এবং শৈশবকালীন ক্যান্সারের ঝুঁকি হ্রাস করা।

বুকের দুগ্ধপানে মায়েদের স্তন এবং ডিম্বাশয়ের ক্যান্সারের ঝুঁকি কমায় এবং প্রসবোত্তর ওজন হ্রাসে অবদান রাখে। এছাড়াও এটি প্রতিরোধযোগ্য রোগের বোঝা কমিয়ে এবং স্বাস্থ্যসেবার খরচ কমিয়ে বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার উপর চাপ কমাতে পারে।

কর্মজীবি নারীদের বাড়ির বাইরে স্তন্যপানকে সমর্থন করতে কর্মক্ষেত্রে উপযুক্ত পরিবেশ গড়ে তোলা উচিত। পহেলা আগস্ট থেকে ‘কর্মজীবী মায়ের সহায়ক পরিবেশ গড়ি, মাতৃদুগ্ধ পান নিশ্চিত করি’ প্রতিপাদ্যে শুরু হয়েছে বিশ্ব মাতৃদুগ্ধ সপ্তাহ। মাতৃত্বকালীন ছুটি শেষ হওয়ার পর নারীরা তাদের কর্মপরিবেশে ফিরে দেখেন- সেখানে আলাদা ফিডিং কর্নার নেই। ফলে মাতৃদুগ্ধ খাওয়ানো ব্যাহত হয়। এভাবে বাড়ছে শিশুমৃত্যুর ও বিভিন্ন রোগের হার।

ব্রেস্ট ফিডিংয়ের জন্যে নির্দিষ্ট কক্ষ এবং বিরতি প্রদানের মাধ্যমে জন্মদানের পর নারীদের কর্মক্ষেত্রে স্তন্যপানে উৎসাহী করা যেতে পারে। এর মাধ্যমে উত্পাদনশীল নারীকর্মী এবং শিশু অসুস্থতার কারণে তাদের অনুপস্থিতি হ্রাস পেয়ে অর্থনীতির প্রসারে সাহায্য করতে পারে।

বাংলাদেশে তরুণ জনগোষ্ঠী উল্লেখযোগ্য হারে অপুষ্টিজনিত চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হচ্ছে। ২০২৩ সালে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের বয়সের তুলনায় উচ্চতা এবং ওজনের তুলনায় উচ্চতার হার যথাক্রমে প্রায় ১২.৫ শতাংশ এবং ২৭.৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। সাধারণত বুকের দুধ অপুষ্টির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে, কারণ এতে রয়েছে অপরিহার্য পুষ্টি ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা যা স্বাস্থ্যকর বৃদ্ধি এবং বিকাশে সহায়তা করে।

গবেষণা দেখা যায় যে বুকের দুধ উন্নত মস্তিষ্ক বিকাশে সহায়তা করে। স্থানীয় ইন্টারন্যাশনাল নেটওয়ার্ক ফর ডায়ারিয়াল ডিজিজ রিসার্চ, বাংলাদেশ (আইসিডিডিআর,বি) দ্বারা একটি সমীক্ষা প্রকাশ করেছে যে, যেসব শিশুরা স্তন্যপান করেছে তারা অন্য শিশুদের থেকে বিশেষ কিছু পরীক্ষায় বেশি নম্বর পেতে সক্ষম হয়েছে। এর মাধ্যমে ধারণা করা যায়- মানব পুঁজির উন্নয়ন এবং দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি লাভে মাতৃদুগ্ধ পানের বিকল্প নেই।

২০২৩ সালে জনসংখ্যার স্বাস্থ্য এবং উন্নতির জন্য স্তন্যপানকে একটি শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে বাংলাদেশ। স্তন্যপানের হার বাড়ানো, মাতৃদুগ্ধের উপকারিতার প্রচার এবং স্তন্যপান-বান্ধব পরিবেশ তৈরির উপর দৃষ্টি নিবদ্ধ করে, বাংলাদেশ একটি স্বাস্থ্যকর ভবিষ্যতের পথ প্রশস্ত করতে পারে।

মাতৃদুগ্ধে বিনিয়োগ শুধুমাত্র একটি স্বল্পমেয়াদী কৌশল নয় বরং একটি স্থিতিশীল ও সমৃদ্ধ জাতি গঠনে আজীবনের প্রতিশ্রুতি। প্রতিটি বাংলাদেশী নাগরিকের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতে স্তন্যপানের প্রচার ও প্রসার অবশ্যম্ভাবী এবং এটি দেশের নীতিনির্ধারক, স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী সম্প্রদায় এবং সকল পরিবারের সম্মিলিত দায়িত্ব। এর মাধ্যমে বাংলাদেশ আগামী প্রজন্মের জন্য একটি সুস্থ ও সমৃদ্ধ ভবিষ্যত তৈরি করতে পারে।

লেখক:

 ডা. নুসরাত ফারুক

সিনিয়র কনসালটেন্ট, পেডিয়াট্রিক্স ও নিওন্যাটোলজি, এভারকেয়ার হসপিটাল, ঢাকা।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে