মশা তাড়ানোর যেসব ওষুধ মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর

0
618

দেশে গত বছরের তুলনায় চলতি বছর কিউলেক্স মশার সংখ্যা চারগুণ বেড়েছে। একইসাথে বেড়েছে মশাবাহিত রোগবালাই। বেড়েছে মানুষের ভোগান্তিও। স্বাভাবিকভাবেই মশার কামড় থেকে রক্ষায় নানা ধরনের রিপেলেন্ট বা মশা বিতাড়নের উপকরণ ব্যবহারও বাড়ছে। এর মধ্যে আছে বিভিন্ন ধরনের কয়েল, স্প্রে ও ক্রিম জাতীয় পণ্য। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় এমনটাই দেখা গেছে।

বাজারে এখন মশা বিতাড়নের সব ধরনের পণ্যের ব্যাপক চাহিদা। চাহিদার সাথে সাথে পণ্যের কার্যকারিতা নিয়ে উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপনেও দেখা যায় প্রতিযোগিতা।

দেশে মশার ওষুধ বাজারজাত করার আগে প্রত্যেকটি পণ্যের জন্য কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের প্লান্ট প্রটেকশন উইং থেকে লাইসেন্স নিতে হয়। সংস্থাটি বলছে, দেশে এ মুহূর্তে ৪৫০টির বেশি ব্র্যান্ডের বিভিন্ন ধরনের মশার ওষুধ পাওয়া যায়। প্রায় ৮০টির মতো প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এগুলো তৈরি ও আমদানি করে বাজারজাত হচ্ছে। কিন্তু এত পণ্যের ভিড়ে কীভাবে বুঝবেন, কোন পণ্যটি মানব স্বাস্থ্যের জন্য ভয়াবহ ক্ষতিকর?

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) প্রাণীবিদ্যা বিভাগের শিক্ষক কবিরুল বাশার বলেছেন, ‘যদি দেখা যায়, মশা তাড়ানোর জন্য ব্যবহার হওয়া কোনো কয়েল, স্প্রে, ক্রিম, বিশেষ ব্যাট বা মশারি ব্যবহারে ঘরের মশা মরে যায়, সাথে ঘরের অন্যান্য পতঙ্গ যেমন টিকটিকি বা অন্য ছোট পোকা মারা যায়। তাহলে বুঝতে হবে সেটি মানবদেহের জন্য চূড়ান্ত ক্ষতিকর।’

রিপেলেন্টের কাজ হচ্ছে মশা তাড়ানো। কিন্তু দেশে দেখা যায় যে অনেক সময় পণ্যের বিজ্ঞাপনে বলা হয় মশা কার্যকরভাবে মেরে ফেলবে। এর মানে হচ্ছে ওই পণ্যে অনুমোদিত মাত্রার চেয়ে বেশি কীটনাশক ব্যবহার করা হচ্ছে, যা মানবদেহের জন্য ভীষণ ক্ষতিকর। তিনি বলেন, ‘এ ধরনের ওষুধে যেমন মানবদেহের ক্ষতি হয়, তেমনি মশার ওপর নির্ভরশীল অন্যান্য প্রাণীকুলও বিপন্ন হয়।’

যেকোনো কীটনাশকের মধ্যে ব্যবহারভেদে দুই মাত্রার রাসায়নিক ব্যবহার করা হয়। এর একটি হচ্ছে অ্যাগ্রিকালচারাল গ্রেড, যা কৃষি ক্ষেত্রে ব্যবহারের জন্য নির্ধারিত মাত্রা। অন্যটি হচ্ছে, পাবলিক হেলথ গ্রেড। অর্থাৎ এটি মানবদেহের সংস্পর্শে আসার জন্য নির্ধারিত মাত্রা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা পাবলিক হেলথ গ্রেডে ব্যবহারের জন্য রাসায়নিকের মাত্রা নির্দিষ্ট করে দিয়েছে, যাতে কম প্রভাব পড়ে বা সহনশীল মাত্রার মধ্যে থাকে।

কয়েল, স্প্রে বা অন্য যেকোনো ওষুধের উপাদানের মধ্যে ব্যবহৃত কীটনাশকের মধ্যে পার্থক্য থাকে। একেক কোম্পানি কীটনাশকের একেক ধরনের জেনেরিক ব্যবহার করে। ফলে একটির সাথে আরেকটির ফলাফলে পার্থক্য থাকে। দেখা যায়, একেক ধরনের মশার জন্য একেক ধরনের ওষুধ রয়েছে। যেমন পূর্ণবয়স্ক মশা তাড়াতে যে ওষুধ লাগবে, লার্ভা নিধনে একই ওষুধ কাজ করবে না।

দেশে সাধারণত মশার কয়েল ও স্প্রেতে পারমেথ্রিন, বায়ো-অ্যালোথ্রিন, টেট্রাথ্রিন, ডেল্ট্রামেথ্রিন, ইমিপোথ্রিননের মতো রাসায়নিক ব্যবহার করা হয়। এ ছাড়াও মশার কয়েল বা স্প্রে ব্যবহারের মাত্রা সম্পর্কে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) নির্দিষ্ট নির্দেশনা আছে। যেমন মশা তাড়ানোর স্প্রে ঘরে ছিটানোর পর ওই ঘরে পরবর্তী ২০ মিনিট মানুষকে থাকতে নিষেধ করা হয়। কারণ ওই স্প্রেতে ছড়ানো কীটনাশকের ড্রপলেটস মাটিতে নেমে আসতে ২০ মিনিট সময় লাগবে। তখন সেখানে মানুষ থাকলে তিনি সরাসরি কীটনাশকের সংস্পর্শে আসবেন, যা ক্ষতিকর।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণীবিদ্যা বিভাগের শিক্ষক কবিরুল বাশার বলেন, নিরাপদ থাকার জন্য মশা মারার বিধি জানতে ও মানতে হবে।

মাত্রা পরিমাপে সরকারের মনিটরিং
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের প্লান্ট প্রটেকশন উইং পরিচালক মোহাম্মদ আবু সাইয়িদ মিয়া বিবিসিকে বলেছেন, কোনো কোম্পানিকে লাইসেন্স পেতে হলে প্রথমে রেজিস্ট্রেশন করতে হয়। এরপর জাতীয় রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটে (আইইডিসিআর) ওই পণ্যের নমুনা পরীক্ষা করাতে হয়। তারা পাস করলে সর্বশেষ সেটি মাঠ পর্যায়ে দু’বার ট্রায়াল চালানো হয়। এতে জনস্বাস্থ্যের ওপর কোনো ক্ষতিকর কিছু না পেলে, সেটিকে অনুমোদন দেয়া হয়। সব ক’টি ধাপ পার হলে ওই পণ্যটিকে ছাড়পত্র দেয়া হয়।

কিন্তু অনেক প্রতিষ্ঠানই নিয়ম মেনে মশার ওষুধ বানায় না। ফলে কয়েল বা স্প্রে বা অন্য কোনো রিপেলেন্ট পণ্যে নির্ধারিত মাত্রার চেয়ে বেশি কীটনাশক থাকে। এতে মানুষের শ্বাসতন্ত্রের ক্ষতি হয়।

অনেক বিশেষজ্ঞ বলে থাকেন, মশার কয়েল মশার স্প্রের চেয়ে বেশি ক্ষতিকর। কারণ মশার কয়েল সারারাত ধরে জ্বলে ও কয়েল জ্বালিয়ে মানুষ ঘরেই অবস্থান করে। কয়েলের ধোঁয়ায় শ্বাসকষ্ট, হাঁপানি ও ফুসফুসের অসুখ হতে পারে। এ ছাড়াও ক্যান্সার ও কিডনি রোগেরও ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। একইসাথে মানুষের চোখ ও হৃদরোগের ঝুঁকিও তৈরি হয়।

গুণগত মান মনিটরিংয়ের জন্য প্রতিটি উপজেলায় দু’জন করে কীটনাশক পরিদর্শক রয়েছেন। মাঝে মধ্যেই যারা পরিদর্শনে গিয়ে অনিয়ম পেলে জরিমানা করেন।

মশা তাড়ানোর প্রাকৃতিক পদ্ধতি
বিশেষজ্ঞদের কেউ কেউ মনে করেন, মশা তাড়াতে কয়েল বা স্প্রে ব্যবহার না করে প্রাকৃতিক উপায় চেষ্টা করে দেখা যেতে পারে। তবে ঢাকায় মশার সংখ্যা যেভাবে বেড়েছে তাতে এসব পদ্ধতি কতটা সুফল দেবে তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।

বছরের পর বছর ধরে মশা তাড়াতে ব্যবহার করা হচ্ছে এমন কয়েকটি প্রাকৃতিক পদ্ধতি এখানে তুলে ধরা হলো-
১. নিমে মশা তাড়ানোর বিশেষ গুণ রয়েছে। প্রাচীনকালে মশা তাড়াতে নিমের তেল ব্যবহার করা হতো। ত্বকে নিম তেল লাগিয়ে নিলে মশা কাছেও আসে না বলে প্রচলিত।

২. বলা হয়ে থাকে, মশা কর্পূরের গন্ধ সহ্য করতে পারে না। ঘরের দরজা-জানালা বন্ধ করে কর্পূর দিয়ে রাখলে মশা পালিয়ে যায়।

৩. লেবু আর লবঙ্গ একসঙ্গে রেখে দিলে ঘরে মশা থাকে না বলে প্রচলিত আছে। এগুলো জানালায় রাখলে মশা ঘরে ঢুকতে পারবে না

৪. ব্যবহৃত চা পাতা ফেলে না দিয়ে রোদে শুকিয়ে সেটা জ্বালালে চা পাতার ধোঁয়ায় ঘরের সব মশা-মাছি পালিয়ে যাবে। কিন্তু এতে শ্বাসতন্ত্রের ক্ষতি হবে না।

সূত্র : বিবিসি

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে