শরীরে ইউরিক এসিডের মাত্রা বাড়ে কেন? কী করবেন

0
212
7 year old female patient speaking with her paediatrician in a doctors office, both are wearing masks due to the new COVID-19 regulations and to avoid the transfer of germs.

দীর্ঘক্ষণ একই ভঙ্গিতে থাকার পর শরীরে অনেক সময় পরিবর্তন দেখা দেয়। পা ফেলতে কষ্ট হয়, জয়েন্টে ব্যথা হয়।

যখন শরীরে ইউরিক এসিডের মাত্রা বেড়ে যায় তখনই এই সমস্যা হয়। রক্তে ইউরিক এসিডের স্বাভাবিক মাত্রা পুরুষদের ক্ষেত্রে ৩.০-৭.০ মি.গ্রা./ ডি.এল এবং মহিলাদের ক্ষেত্রে ২.৪-৫.৭ মি.গ্রা./ডি.এল।

ইউরিক এসিড হচ্ছে অক্সিজেন, নাইট্রোজেন এবং কার্বনের হেটারোসাইক্লিক যৌগিক পদার্থ। এটি মানবদেহের অ্যান্ড কম্পাউন্ড, যা কিডনি দ্বারা ফিল্টারেট হয়ে প্রস্রাবের সঙ্গে শরীর থেকে বেড়িয়ে যায়। যদি কোনো কারণে এই ইউরিক এসিড তৈরির প্রক্রিয়ায় গোলমাল হয় বা কিডনি দ্বারা কম বের হয় তখন রক্তে এর মাত্রা বেড়ে যায়।

এ বিষয়ে বিস্তারিত জানিয়েছেন আল রাজি হাসপাতালের কনসালটেন্ট (পথ্য ও পুষ্টি) তামান্না রুবিন।

বেশকিছু কারণে শরীরে ইউরিক এসিডের মাত্রা বেড়ে যেতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে ডাইইউরেটিক, এ্যালকোহল, অবিসিটি বা ওজনাধিক্য, কিডনির সমস্যা, হাইপোথাইরয়েডিজম, সোরিয়াসিস বা পাঁচড়া জাতীয় চর্মরোগ, জেনেটিকস, টিউমার, লাইসিস সিন্ড্রোম, ইমিউন সাপ্রেসিং ড্রাগস, নায়াসিন বা ভিটামিন বি-৩, অতিরিক্ত পিউরিন সমৃদ্ধ খাবার ইত্যাদি।

রক্তের ইউরিক এসিডের ৩ ভাগের ২ ভাগ আসে দেহের পিউরিন নামক পদার্থ ভেঙ্গে এবং ১ ভাগ আসে খাবার থেকে। খাবারে থাকা পিউরিন এবং প্রোটিন ডিগ্রেডেশন শরীরে ইউরিক এসিডের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়।

দুই-তৃতীয়াংশ মানুষের ক্ষেত্রে এই বাড়তি ইউরিক এসিড শরীরের কোনো ক্ষতি করে না। কারো কারো ক্ষেত্রে রক্তে ইউরিক এসিড অতিমাত্রায় বেড়ে গেলে যে অবস্থার সৃষ্টি হয় তাকে হাইপার ইউরেসিমিয়া বলে।

তখন বাড়তি ইউরিক এসিড জয়েন্ট বা গিড়ায় ক্রিস্টাল সৃষ্টি করে, গিড়ায় তীব্র ব্যথা অনুভূত হয় এবং লাল হয়ে ফুলে যায়, জ্বালাপোড়া করে। এই অবস্থাকে গাউট বা গেঁটে বাত বলে। শুরুতে গাউটে একটিমাত্র গিরা বিশেষ করে পায়ের বুড়ো আঙ্গুল আক্রান্ত হয়। এ ছাড়াও ইউরিক এসিডের কারণে আর্থ্রাইটিস, জুভেনাইল আর্থ্রাইটিস, মেটাবলিক এসিডোসিস, কিডনি স্টোনও হতে পারে।

চিকিৎসকের কাছে গিয়ে টেস্ট করিয়ে প্রয়োজনীয় ওষুধ সেবন করা যেমন জরুরি ঠিক তেমনি একজন পুষ্টিবিদের পরামর্শ গ্রহণও গুরুত্বপূর্ণ। রক্তে ইউরিক এসিডের মাত্রা বেড়ে গেলে তা নিয়ন্ত্রণে ওষুধের চেয়ে বেশি কার্যকর হচ্ছে সঠিক ডায়েট। ডায়েটের মাধ্যমে খুব সহজেই রক্তের ইউরিক এসিডের মাত্রা কমিয়ে ফেলা যায়। কারণ, খাবারে পিউরিনের মাত্রা বা পিউরিনসমৃদ্ধ খাবার বেশি খেলে ইউরিক এসিডের মাত্রা অনেক গুণ বেড়ে যায়। ইউরিক এসিডের মাত্রা স্বাভাবিক করতে কিছু খাদ্য খাদ্য তালিকা থেকে বর্জন করা উচিত।

যে খাবারে ইউরিক এসিড বেশি থাকে

* সামুদ্রিক মাছ, গরু ও খাসির মাংস, হাঁস বা ভেড়ার মাংস, কলিজা, মগজ, ফুসফুস, গুর্দা, মাশরুম, মুরগির চামড়া, চিংড়ি, কাঁকড়া, শুঁটকি, ইলিশ মাছ, মাংসের স্যুপ, পায়া, মাছের কাঁটা, মাছের ডিম।

* মসুর ডাল, মাষকলাই ডাল, মটর, চিনাবাদাম, কাঠবাদাম, তিল, সিমের বীচি।

* পুঁই শাক, পালং শাক, মুলা শাক, পাট শাক।

* মুলা, ঢ়েঁড়স, মিষ্টি কুমড়া, বীচি জাতীয় খাবার, মিষ্টি আলু, ওলকপি, বিট, টমেটো, বাঁধাকপি, ফুলকপি, সজনে, সিম, বরবটি, কাঁঠালের বীচি, সিমের বীচি, বেগুন।

* সব ডাল, বাদাম ও বাদাম জাতীয় খাদ্য, লবণ যুক্ত খাদ্য, অতিরিক্ত চর্বিযুক্ত ও তেলে ভাজা খাবার, হাঁসের ডিম, কফি, আচার, ইস্ট বা ইস্টের তৈরি যে কোনো খাবার, পনির।

যে খাবার গ্রহণ করা যেতে পারে

* প্রোটিন- যেহেতু এ সব রোগীদের ক্ষেত্রে প্রোটিন জাতীয় খাবার বর্জন করার পরামর্শ দেয়া হয় তাই সারা দিনের প্রোটিনের চাহিদা মেটাতে মিঠা পানির মাছ ও চামড়া ছাড়া মুরগী, ডিমের সাদা অংশ, টক দই, দুধ গ্রহণ করা যেতে পারে।

* শাক- লাল শাক, ডাটা শাক, সরিষা শাক, লাউ শাক।

* সবজি- কাঁকরোল, পেঁপে, ধুন্দল, চিচিঙ্গা, পটল, করলা (অবশ্যই বীচি ছাড়া)।

* ফল- সবুজ আপেল, নাশপাতি, পাকা পেঁপে, বীচি ছাড়া পেয়ারা, বীচি ছাড়া পাকা বেল।

* অন্যান্য- চাল, আটা, ময়দা, সুজি, ভুট্টা, সেমাই, চিড়া, মুড়ি, কর্নফ্লেক্স, সাবুদানা, মুগ ডাল (অল্প পরিমাণে)।

* পানি- অবশ্যই পর্যাপ্ত পানি পান করতে ভুলবেন না। পানি আপনার শরীরের ইউরিক এসিডকে ইউরিনের মাধ্যমে শরীর থেকে বের করে ফেলে রক্তে ইউরিক এসিডের মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করবে।

সঠিক ডায়েটের পাশাপাশি ‘থেরাপিউটিক ফুড’ ইউরিক এসিডকে কমিয়ে দিতে ভালো কাজ করে

* ১ গ্লাস লাউয়ের জুস, ১ চামচ মৌরির গুঁড়া, ২/৩টি গোল মরিচের গুঁড়া ভালোভাবে মিক্স করে সকালবেলার নাশতার সময় খেতে পারেন। উপকারিতা- এতে ভিটামিন ‘বি’ ও ‘সি’ আছে, যা ডিটক্সিফিকেশন হিসেবে কাজ করে বডির ইউরিক এসিডকে কমিয়ে দেয়।

* ২০০ মিলি পানির সঙ্গে ২ চা চামচ মেথি রাতে ভিজিয়ে রাখতে হবে। সকালে পানি ছেঁকে নিয়ে মেথিগুলো পেস্ট বানিয়ে সেই ২০০ মিলি পানির সঙ্গে জ্বাল করে ফুটাতে হবে। এই পানীয় সকালের নাশতা খাবার ১০-১৫ মিনিট আগে খেতে হবে। উপকারিতা- আয়রন খুব বেশি থাকে এবং ব্যথা দূর করে।

* ১ চামচ মধুর সঙ্গে ১ চামচ কালো জিরার তেল মিক্সড করে ১০-১৫ দিন খেতে পারেন। উপকারিতা- ব্যথা দূর করতে বেশ কার্যকারী।

* দৈনিক কাঁচা রসুন খেতে পারেন ৫/৬টি কোয়া। উপকারিতা- ব্যথা দূর করতে কার্যকারী।

সঠিক ডায়েটের মাধ্যমে ইউরিক এসিডের মাত্রা কমে গেলে ২ মাস পর আবার রক্তের ইউরিক এসিডের মাত্রা পরীক্ষা করুন। ইউরিক এসিডের মাত্রা স্বাভাবিক হলেও সহসাই আবার বাদকৃত খাবারগুলাকে খাদ্য তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা যাবে না, ধীরে ধীরে বিশেষজ্ঞের পরামর্শে স্বাভাবিক খাদ্য তালিকায় ফিরে যেতে হবে। রক্তে ইউরিক এসিড বেড়ে গেলে অবশ্যই সঠিক ডায়েট ঠিক করে ফেলুন যা খুব সহজেই ব্যথামুক্ত এবং অতিশিগগির সুস্থ করে তুলতে সাহায্য করবে।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে