স্বাস্থ্য সুরক্ষা অর্জনে চাই স্বাস্থ্যবীমা

0
144
abm abdullah

অসংক্রামক রোগ দিন দিন বেড়েই চলেছে। জটিল কোনো রোগ যেমন ক্যান্সার, হার্ট, লিভার বা কিডনি বিকল, স্ট্রোক বা দুর্ঘটনায় অঙ্গহানি হলে অসচ্ছলদের পক্ষে টাকার অভাবে চিকিৎসা নেওয়া অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। এ ছাড়া জন্মের পর থেকে প্রতিবন্ধী রোগীরা যেমন অটিজম, ডাউন সিনড্রোম, বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী ও সেরিব্রাল পলসি, যাদের সারা জীবন চিকিৎসাসেবা চালিয়ে যেতে হবে তাদের জন্যও ব্যয় নির্বাহ করা অনেক পরিবারের জন্য দুঃসাধ্য হয়ে পড়ে। এ ছাড়া চিকিৎসা ব্যয় বৃদ্ধি, ওষুধের আকাশচুম্বী দাম, রোগ নির্ণয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষার উচ্চ খরচ, বেড চার্জ, অ্যাডমিশন ফি, মাত্রাতিরিক্ত অপারেশন চার্জ, সিসিইউ, আইসিইউ এবং ডায়ালাইসিসের উচ্চতর ফি ইত্যাদি কারণে চিকিৎসা ব্যয় বেড়েই চলেছে। ফলে প্রতিবন্ধীসহ যারা দীর্ঘমেয়াদি রোগে ভোগেন তাদের অনেকের পক্ষে যেমন চিকিৎসার খরচ চালানো অনেকটাই অসম্ভব, তেমনি এসব রোগের চিকিৎসা ব্যয় মেটাতে দিন দিন অনেকেই আরও গরিব হয়ে পড়ছেন। দ্রুত স্বাস্থ্য খাত বীমার আওতায় আনতে না পারলে ব্যক্তিগত চিকিৎসার ব্যয় বাড়তেই থাকবে এবং মানুষের দীনতা আরও বেড়েই চলবে।

অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থানের মতো চিকিৎসা একটি মৌলিক অধিকার। চিকিৎসা ব্যয়ের প্রায় ৬৯ শতাংশ ব্যক্তি নিজে বহন করেন, আর এ ব্যয়ভার বহন করতে গিয়ে প্রতি বছর ৮৬ লাখের বেশি মানুষ গরিব থেকে আরও গরিব হচ্ছে। ব্যয় বেশি হওয়ার কারণে ৩ কোটির বেশি মানুষ প্রয়োজন হলেও চিকিৎসকের কাছে বা হাসপাতালে যেতে পারেন না। নিম্ন বা সীমিত আয়ের লোকজন চিকিৎসার জন্য নিজেরা আলাদা কোনো টাকা বরাদ্দ রাখেন না। ফলে যে-কোনো রোগের বা জরুরি চিকিৎসার প্রয়োজন মেটাতে তাকে হিমশিম খেতে বা দৈন্যদশায় পড়তে হয়। এমনকি নিজের শেষ সম্বল বা ঘরবাড়ি বিক্রি করে অথবা ঋণ নিয়ে চিকিৎসাসেবা চালাতে হয়। এত কিছু করেও চিকিৎসা নিয়ে রোগ নিরাময় হবে কি না অথবা অনিরাময় কোনো রোগে আক্রান্ত রোগী বেঁচে থাকবেন কি না তার কোনো নিশ্চয়তা কিন্তু নেই। নির্মম সত্য হলো, চিকিৎসার খরচ মেটাতে গিয়ে পরিবারটি যে পথে বসতে পারে বা আর্থিক দীনতায় পড়বে তা কিন্তু শতভাগ সত্য। অথচ এ অবস্থায় পড়তে হতো না যদি তাদের স্বাস্থ্যবীমা থাকত।

স্বাস্থ্যবীমা সম্পর্কে জানার আগে বীমা সম্পর্কে কিছু জানা দরকার। বীমা বা ইন্স্যুরেন্স হচ্ছে বীমা কোম্পানি এবং ব্যক্তির মধ্যে একটি চুক্তি, যার মাধ্যমে বীমা কোম্পানি সেই বীমাকৃত ব্যক্তির প্রদত্ত প্রিমিয়ামের বিনিময়ে তাকে কোনো আকস্মিক আর্থিক ক্ষতির জন্য ক্ষতি পূরণ করার প্রতিশ্রুতি দেয়। বীমা চুক্তিকে সাধারণভাবে ‘বীমা পলিসি’ বলা হয় এবং যে ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান বীমা পলিসি গ্রহণ করে তাকে ‘বীমাগ্রহীতা’ বলা হয়। বীমা এক ধরনের আর্থিক সেবা যা ব্যক্তি, পরিবার বা কোম্পানিকে অসংখ্য ঝুঁকি থেকে রক্ষা করে এবং ব্যক্তিগত জীবনের বা ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত বিভিন্ন ঝুঁকির বিপরীতে সুরক্ষা দেয়। যেমন আকস্মিক অসুস্থতা, দুর্ঘটনা, আগুন লাগা বা প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে ক্ষয়ক্ষতি ইত্যাদি। এসব ঝুঁকির কারণে অর্থনৈতিক ক্ষতি হলে বীমা কোম্পানি আর্থিক ক্ষতিপূরণ প্রদান করে।

স্বাস্থ্যবীমা : একজন ব্যক্তির অসুস্থতায় চিকিৎসা ব্যয় বহন করার জন্য বীমা কোম্পানির সঙ্গে যে চুক্তি করা হয় সেটাই স্বাস্থ্যবীমা। স্বাস্থ্যসেবার সামগ্রিক ঝুঁকি ও স্বাস্থ্যসংক্রান্ত ব্যয়ের আনুমানিক হিসাব অনুযায়ী, একজন বীমাকারী বিভিন্ন ধরনের স্বাস্থ্যবীমা গ্রহণ করতে পারেন, যেমন নিজের স্বাস্থ্য পরিস্থিতির বিপরীতে নির্দিষ্ট অঙ্কের মাসিক প্রিমিয়ামের অর্থ অথবা পে-রোল ট্যাক্স, এ উদ্দেশ্যে জমা করেন যা বীমার চুক্তি অনুযায়ী বীমা কোম্পানি ব্যক্তিটির জরুরি চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় খরচ জোগাবে। যেমন অসুস্থ হলে চিকিৎসা খরচ, প্রতিবন্ধিত্ব বা দুর্ঘটনার ক্ষতিপূরণ অথবা দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যুর ক্ষতিপূরণ প্রদান। অর্থাৎ স্বাস্থ্য সমস্যা দেখা দিলে ওই বীমা প্রতিষ্ঠান সেই ব্যক্তির চিকিৎসাসংক্রান্ত ব্যয়ের সম্পূর্ণ বা একটি বড় অংশ প্রদান করে। সাধারণত বীমা কোম্পানি স্বাস্থ্যবীমা তালিকাভুক্ত হাসপাতালগুলোয় ‘ক্যাশলেস’ সেবা অথবা সেবা গ্রহণ-পরবর্তীকালে গ্রাহককে বীমার অর্থ প্রদান করে থাকে।

প্রত্যেক নাগরিকের স্বাস্থ্যবীমা থাকা জরুরি : স্বাস্থ্যবীমা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এর মাধ্যমে যে-কোনো ব্যক্তি খুব অল্প পরিমাণ প্রিমিয়াম প্রদানের বিনিময়ে প্রয়োজনীয় আর্থিক সুরক্ষা পেতে পারেন এবং চিকিৎসা ব্যয়সহ বিভিন্ন ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও অপারেশনের জন্য যা খরচসহ তার পুরোটা বা নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা কোম্পানি দিতে বাধ্য থাকবে। স্বাস্থ্যবীমার আরও অনেক সুবিধা আছে। যেমন- হাসপাতালে ভর্তি অবস্থায় রোগ নির্ণয়ের সব পরীক্ষা, ডাক্তারের পরামর্শ ফি, অপারেশন খরচ এবং যে-কোনো অনাকাক্সিক্ষত অসুস্থতা, দুর্ঘটনা বা মেডিকেল ইমারজেন্সি হলে স্বাস্থ্যবীমা আর্থিক সুরক্ষা দেয়, যার ফলে যে-কোনো বিপদের মুহূর্তে ইন্স্যুরেন্স প্ল্যানের মাধ্যমে অ্যাম্বুলেন্স চার্জ থেকে শুরু করে ডে-কেয়ার পর্যন্ত সবকিছুর জন্য প্রয়োজনীয় আর্থিক সুযোগ পাওয়া যাবে।

বীমা কোম্পানিগুলোর সঙ্গে কোনো কোনো হাসপাতালের চুক্তি থাকে, যার আওতায় হাসপাতালে ভর্তি বীমাকারী রোগীকে নগদহীন চিকিৎসা প্রদান করে এবং বীমাকারীদের প্রাপ্ত চিকিৎসার সঙ্গে সম্পর্কিত খরচগুলো ব্যক্তিটি দাবি করার পর বীমা কোম্পানি পুরো খরচের বা একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা প্রদান করবে। অনেক স্বাস্থ্যবীমা পলিসি অতিরিক্ত খরচ বা গুরুতর অসুস্থতার জন্য কভার প্রদান করবে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে স্বাস্থ্যবীমা করা থাকলে উন্নতমানের স্বাস্থ্যসেবাও নেওয়া যায় এবং কেউ মৃত্যুবরণ করলে সম্পূর্ণ বীমার টাকা নমিনিকে প্রদান করা হয়।

আমাদের দেশে স্বাস্থ্যবীমা কি সম্ভব? : পৃথিবীর উন্নত দেশ ও কল্যাণ রাষ্ট্রগুলোয় মানুষের স্বাস্থ্যসেবা অনেকাংশে বীমার ওপর নির্ভরশীল। ফলে স্বাস্থ্যসেবার ব্যয় মেটাতে সেসব দেশের জনগণকে আর্থিক সমস্যায় পড়তে হয় না।

বাংলাদেশে এটি একেবারেই উদীয়মান পর্যায়ে রয়েছে আর বিপুল জনগোষ্ঠী এ ব্যাপারে অবহিত নয় এবং এর আওতার বাইরে। এমনকি স্বাস্থ্যবীমা শব্দটি অনেক মানুষের কাছে প্রায় অপরিচিত। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রোগীর সুরক্ষায় স্বাস্থ্যবীমা চালু থাকলেও বাংলাদেশে এখনো এ সেবা সফলভাবে চালু করা সম্ভব হয়নি। সেবা প্রাপ্তির নিশ্চয়তা থাকার পরও দেশের অধিকাংশ মানুষই স্বাস্থ্যসেবা পেতে বীমা করতে আগ্রহী নয়। তা ছাড়া আগে টাকা দিয়ে পরে সেবা গ্রহণের মনোভাব না থাকা এবং একজনের টাকায় অন্যজনের চিকিৎসা বিষয়েও অনীহা রয়েছে। তাই স্বাস্থ্যবীমা নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে না। অথচ এ খাতের মাধ্যমে সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া সম্ভব।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, একটি নিম্নমধ্য আয়ের দেশে স্বাস্থ্যসেবার জন্য মাথাপিছু প্রয়োজন হবে ১৪৬ ডলার। সেখানে বাংলাদেশে স্বাস্থ্য খাতে মাথাপিছু ব্যয় ৪৬ ডলার, যার ৬৯ শতাংশ ব্যক্তির নিজের ব্যয়। ফলে আকস্মিক স্বাস্থ্য ব্যয় নিজের পকেট থেকে মেটাতে গিয়ে বাংলাদেশে প্রতি বছর জনগণের বিশাল অংশ দরিদ্র হয়ে পড়ছে। সারা পৃথিবীতে স্বাস্থ্যসেবার খরচের ধাক্কায় ১০ কোটির বেশি মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যাচ্ছে। এ প্রেক্ষাপটে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা তার সব সদস্য রাষ্ট্রকে সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা (ইউনিভার্সাল হেলথ কাভারেজ) নিশ্চিত করার জন্য প্রতিশ্রুতিবদ্ধ করেছে। এর মানে হলো, কোনো আর্থিক সংকট ছাড়া প্রত্যেকেই প্রয়োজন অনুযায়ী মানসম্পন্ন স্বাস্থ্যসেবা পাবে।

স্বাস্থ্যসেবা পেতে বাংলাদেশের মানুষকে মোট স্বাস্থ্য ব্যয়ের বিশাল অংশ নিজের পকেট থেকে খরচ করতে হয়। ২০১৫ সালে প্রকাশিত বাংলাদেশ ন্যাশনাল হেলথ অ্যাকাউন্টের তথ্যমতে সেবা নিতে গিয়ে জনপ্রতি ৬৭ টাকা পকেট থেকে ব্যয় করতে হয়, ২০১২ সালে যা ছিল ৬৩ টাকা। তবে বর্তমানে পকেট থেকে ব্যয় দাঁড়িয়েছে ৬৯ টাকা। স্বাস্থ্যসেবা পেতে বীমা নিতে অনাগ্রহের কারণে অধিকসংখ্যক মানুষকে সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষার (ইউএইচসি) আওতায় আনা যাচ্ছে না। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার (এসডিজি) অর্জনের উদ্দেশ্যের মধ্যে অন্যতম সবার জন্য সুস্বাস্থ্য। কারণ দেশের সব ধরনের উন্নয়নের স্থায়িত্বের জন্য সবার আগে প্রয়োজন জনগণের সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করা। এজন্য সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা কর্মসূচির এবং স্বাস্থ্যবীমার বিকল্প নেই। কিন্তু দেশের অধিকাংশ মানুষ স্বাস্থ্যবীমার প্রতি অনাগ্রহী। এ পরিপ্রেক্ষিতে দেশে স্বাস্থ্যবীমা নিশ্চিত করা সহজ নয়। এর জন্য সমন্বিত সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগ প্রয়োজন।

পৃথিবীর কোনো দেশেই রাতারাতি এটি চালু করা হয়নি, এমনকি শতভাগ নাগরিককে স্বাস্থ্যবীমার আওতায় আনা সম্ভব হয়নি। কারণ একটি দেশের আর্থিক অবস্থা, রাজনৈতিক পরিস্থিতি, নাগরিকের ক্রয়ক্ষমতা ও মনমানসিকতার ওপর নির্ভর করেই স্বাস্থ্যবীমা চালু করতে হয়। ফলে এটি বাস্তবায়ন হতেও দীর্ঘ সময়ের প্রয়োজন। প্রকৃতপক্ষে স্বাস্থ্য একটি অপরিহার্য সম্পদ এবং স্বাস্থ্যকর জীবন বজায় রাখার জন্য স্বাস্থ্যবীমা পাওয়া গুরুত্বপূর্ণ, যা কোনো অপ্রত্যাশিত চিকিৎসা ব্যয়ের ক্ষেত্রে একটি নিরাপত্তা জাল তৈরি করে।

আমাদের দেশের কেউ চাইলেই সহজে সবাইকে বীমার আওতায় আনা হয়তো সম্ভব হবে না, তবে উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। আয়ের অনুপাতে এবং পরিবারের সদস্যসংখ্যা অনুযায়ী বীমার প্রিমিয়াম নির্ধারণ করা যেতে পারে। প্রথমে উচ্চবিত্ত থেকে ক্রমান্বয়ে মধ্যবিত্তদের আগে বীমার আওতায় আনতে হবে। পরে দরিদ্র জনগোষ্ঠীকেও বীমার আওতায় আনতে হবে, খুবই স্বল্পমূল্যে বা সম্ভব হলে বিনামূল্যে। এমনকি দরিদ্রদের প্রিমিয়াম সরকারিভাবে দেওয়া যেতে পারে। এতে নিম্ন আয়ের ও ছিন্নমূল জনগোষ্ঠীর চিকিৎসাসেবা সহজ হবে, বাজেটে এ লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় বরাদ্দ রাখা যেতে পারে।

দেশে প্রচলিত প্রাইভেট ইন্স্যুরেন্স কেম্পানিগুলোর ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যবীমা খুব গ্রহণযোগ্য না হলেও গ্রুপ স্বাস্থ্যবীমা খুবই জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। বহু প্রতিষ্ঠান এ গ্রুপ হেলথ ইন্স্যুরেন্স করছে। এর বাইরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, গ্রামীণ ব্যাংকসহ আরও বেশকিছু প্রতিষ্ঠান নিজস্ব আঙ্গিকে স্বাস্থ্যবীমা চালু করেছে। অন্যদিকে কমিউনিটি পর্যায়ে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রসহ আরও কয়েকটি সংস্থা কাজ করছে। এখন জরুরি হয়ে উঠেছে সরকারের সিদ্ধান্ত। বেসরকারি পর্যায়ের স্বাস্থ্যবীমার কার্যক্রমের সঙ্গে সরকারি কার্যক্রমের সমন্বয় ঘটিয়ে সারা দেশের মানুষের জন্য একটি কার্যকর স্বাস্থ্যবীমা পদ্ধতি চালু করা। যার মধ্য দিয়ে সরকারের সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা পরিকল্পনা বাস্তবায়নও সহজ হয়ে উঠবে।

বীমার সেবা বা খরচের হিসাব সুষ্ঠু করতে সরকারি হাসপাতাল ছাড়াও বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতাল বীমা গ্রহণের এবং সেবা প্রদানের জন্য নিবন্ধনব্যবস্থার আওতায় আনা যেতে পারে। এমনকি বীমা ব্যবহারকারীদের চিকিৎসার ক্ষেত্রে বিভিন্ন রোগ অনুযায়ী সাধারণ প্যাকেজভিত্তিক সেবা চালু করা যেতে পারে। অর্থাৎ বীমা ব্যবহার করলে সে নির্ধারিত হাসপাতালগুলো থেকে নির্দিষ্ট রোগের চিকিৎসা একটি নির্দিষ্ট খরচে পাবে। ফলে বীমার মাধ্যমে চিকিৎসাসেবা পাওয়া যেমন সহজতর হবে, তেমনি চিকিৎসা খরচ ও বীমার অর্থ ব্যয়ের জটিলতাও থাকবে না।

স্বাস্থ্যবীমা ব্যবস্থা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে আরও একটা বিষয় নিশ্চিত করা প্রয়োজন, আসলেই যারা গরিব তারাই যেন ফ্রি বা স্বল্পমূল্যের সুবিধা পান। আবার বিত্তবানরা স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে যেন বীমার আওতায় চলে আসেন। কারণ এখানে তিনি শুধু নিজের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় বীমা করছেন না, বরং  পরোক্ষভাবে অন্য আরেকজনের চিকিৎসাসেবায় সহায়তা করে দেশের সার্বিক স্বাস্থ্যসেবা খাতে গঠনমূলক ভূমিকা রাখছেন, পরোপকারের মহান ব্রত নিয়ে। এখানে আরও একটা বিষয় নিশ্চিত করতে হবে, যেন গতানুগতিক বীমার মতো সেবা পেতে কাউকে হয়রানি করা না হয়। সাধারণ বীমার মতো সেবার টাকা ওঠাতে গিয়ে যদি অফিসের টেবিলে টেবিলে দৌড়াতে হয়, তবে মানুষ কিন্তু আগ্রহ হারিয়ে ফেলবে। কারণ স্বাস্থ্য বিষয়টি সব সময়ই স্পর্শকাতর, তাই যে মানুষটি বিপদের শঙ্কায় বছরব্যাপী বীমার প্রিমিয়াম জমা দিল, তাকে তার প্রয়োজনের সময় যত দ্রুত সম্ভব প্রাপ্যটা সরবরাহের ব্যবস্থা করতে হবে। কোনো প্রকার হয়রানি যেন না হয় সে ব্যাপারে যথোপযুক্ত ব্যবস্থা নিতে হবে।

বাংলাদেশের জনসংখ্যার তুলনায় দরিদ্র ও নিম্নমধ্যবিত্তের সংখ্যাও কম নয়। দরিদ্র জনগণের সব রকমের চিকিৎসা ব্যয় মেটানো এক বিরাট চ্যালেঞ্জ। তবে স্বাস্থ্যবীমা করা থাকলে এ চ্যালেঞ্জ শতভাগ না হলেও অনেকটা মেটানো সম্ভব। কিন্তু এ কথা সত্য, আমাদের দেশে স্বাস্থ্যবীমা চালু করা অত্যন্ত কঠিন এবং এর বাস্তবায়ন আরও কঠিন। তবে সরকার যদি একে বাধ্যতামূলক করে তাহলে কাজটি এগিয়ে নেওয়া সম্ভব। সর্বোপরি স্বাস্থ্যবীমা করা থাকলে রোগীদের বিশেষ করে হতদরিদ্র বা সহায়সম্বলহীনদের উন্নত ও জরুরি চিকিৎসা দেওয়া যেমন সম্ভব হবে, তেমনি আর্থিক দৈন্যের কারণে তাদের চিকিৎসা প্রাপ্তিও ব্যাহত হবে না। তবেই সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা কর্মসূচি বাস্তবায়ন সম্ভবপর হবে, যার মূল লক্ষ্য সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করা এবং এ খাতে ব্যক্তিগত ব্যয় শূন্যের কোঠায় কমিয়ে আনা। মানুষের জীবনযাত্রার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে চিকিৎসা ব্যয় বেড়ে চলেছে। যে-কোনো মানুষের স্বাস্থ্য রক্ষা করতে এবং চিকিৎসার জন্য আর্থিক সাহায্য পেতে, স্বাস্থ্যবীমা পলিসি করা এখন সময়ের দাবি।

লেখক :

 ইমেরিটাস অধ্যাপক ডা. এ বি এম আবদুল্লাহ

প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত চিকিৎসক

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে