অনেকেই মনে করেন, ক্যালসিয়ামের অভাব হলেই হাড় ক্ষয় (Bone Loss) শুরু হয়। বাস্তবে বিষয়টি আরও জটিল। হাড় একটি জীবন্ত টিস্যু, যা সারাজীবন ভাঙা-গড়ার (Bone Remodeling) প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যায়। এই প্রক্রিয়ায় কেবল ক্যালসিয়াম নয়, বিভিন্ন ভিটামিন, খনিজ, হরমোন ও জীবনযাপনের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
হাড়ের ঘনত্ব কমে গেলে এবং গঠন দুর্বল হয়ে গেলে যে অবস্থার সৃষ্টি হয়, তাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানে বলা হয় Osteoporosis। এই রোগে সামান্য আঘাতেই হাড় ভেঙে যেতে পারে। বিশেষ করে ৪০ বছরের পর নারীদের মধ্যে ঝুঁকি বেশি দেখা যায়, এবং রজঃনিবৃত্তির পর তা আরও বৃদ্ধি পায়।
হাড় দুর্বল হওয়ার প্রধান কারণসমূহ
১. হরমোনজনিত পরিবর্তন
নারীদের ক্ষেত্রে রজঃনিবৃত্তির পর ইস্ট্রোজেন হরমোনের মাত্রা কমে যায়। ইস্ট্রোজেন হাড়ের ঘনত্ব বজায় রাখতে সহায়ক। এর ঘাটতিতে দ্রুত Bone Resorption হয় এবং Osteoporosis-এর ঝুঁকি বাড়ে।
২. ভিটামিন ডি-এর অভাব
ভিটামিন ডি ছাড়া শরীর ক্যালসিয়াম যথাযথভাবে শোষণ করতে পারে না। পর্যাপ্ত ভিটামিন ডি না থাকলে খাদ্য থেকে পাওয়া ক্যালসিয়ামের মাত্র ১০–১৫% শোষিত হয়।
উৎস:
• সূর্যের আলো
• ডিমের কুসুম
• সামুদ্রিক মাছ
• মুরগির কলিজা
• কিছু সবুজ শাকসবজি
৩. ম্যাগনেশিয়ামের ঘাটতি
ম্যাগনেশিয়াম পেশি ও স্নায়ুর স্বাভাবিক কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ। এর অভাবে পেশিতে টান ধরা, ক্লান্তি, উচ্চ রক্তচাপ এবং হাড় দুর্বলতা দেখা দিতে পারে।
উৎস:
• সবুজ শাকসবজি
• কাঠবাদাম, আখরোট, কাজু
• ওটস, ডালিয়া, কিনোয়া
• ছোট মাছ ও সামুদ্রিক মাছ
৪. ভিটামিন কে-এর অভাব
ভিটামিন কে হাড়ে ক্যালসিয়াম সঠিকভাবে জমা করতে সহায়তা করে। এটি Osteocalcin সক্রিয় করতে সাহায্য করে, যা হাড়ের গঠন মজবুত করে।
উৎস:
• পালং শাক, সর্ষে শাক, নটে শাক
• ব্রোকোলি
• বাঁধাকপি
• সয়াবিন
• ডিমের কুসুম
৫. জিংক-এর ঘাটতি
জিংক রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি হাড়ের কোষ বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখে। জিংকের অভাবে হাড়ের পুনর্গঠন প্রক্রিয়া ব্যাহত হয়।
উৎস:
• দুধ ও দুগ্ধজাত খাবার
• কুমড়োর বীজ
• বাদাম
• ডিম
৬. ফসফরাসের ঘাটতি
ফসফরাস ক্যালসিয়ামের সঙ্গে মিলে হাড়ের গঠন তৈরি করে। তবে অতিরিক্ত ফসফরাস (বিশেষত সফট ড্রিংক থেকে) ক্যালসিয়াম ভারসাম্য নষ্ট করতে পারে।
উৎস:
• দুধ, দই, পনির
• মাছ ও মাংস
• বাদাম
• দানাশস্য
৭. ভিটামিন সি-এর অভাব
ভিটামিন সি কোলাজেন তৈরিতে সহায়ক, যা হাড়ের ম্যাট্রিক্স গঠনে গুরুত্বপূর্ণ।
উৎস:
• লেবুজাতীয় ফল
• পেয়ারা
• টমেটো
• ক্যাপসিকাম
• স্ট্রবেরি
• পেঁপে
ঝুঁকির অন্যান্য কারণ
• দীর্ঘদিন স্টেরয়েড সেবন
• শারীরিক পরিশ্রমের অভাব
• ধূমপান ও অ্যালকোহল
• কম ওজন
• পরিবারে Osteoporosis-এর ইতিহাস
প্রতিরোধের উপায়ঃ
- নিয়মিত ওজনবহনকারী ব্যায়াম (Weight-bearing Exercise)
- পর্যাপ্ত সূর্যালোক গ্রহণ
- সুষম খাদ্য
- প্রয়োজনে Bone Mineral Density (BMD) পরীক্ষা
-চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ
উপসংহার
হাড়ের স্বাস্থ্য রক্ষায় শুধু ক্যালসিয়াম নয়—ভিটামিন ডি, কে, ম্যাগনেশিয়াম, জিংক, ফসফরাস ও ভিটামিন সি-সহ সমন্বিত পুষ্টি প্রয়োজন। বিশেষ করে ৪০ বছরের পর এবং রজঃনিবৃত্তি-পরবর্তী নারীদের ক্ষেত্রে সচেতনতা অত্যন্ত জরুরি।
লেখকঃ
ডা. এম. ইয়াছিন আলী
চেয়ারম্যান ও চিফ কনসালট্যান্ট
ঢাকা সিটি ফিজিওথেরাপি হাসপাতাল






Leave a Reply