স্বাস্থ্য পরামর্শে এআই কতটা নিরাপদ?

স্বাস্থ্যসংক্রান্ত পরামর্শের জন্য অ্যাবি নিয়মিতভাবে ব্যবহার করেন চ্যাটজিপিটি। গত এক বছর ধরে নিজের স্বাস্থ্য পরিস্থিতি বুঝতে ও সামলাতে তিনি সাহায্য নিচ্ছেন এই জনপ্রিয় এআই চ্যাটবটের। 

এর আকর্ষণ অস্বীকার করার মতো নয়। অনেকের মতো তার কাছেও চ্যাটজিপিটি, জেমিনি বা গ্রকের মতো এআই শুধু একটা প্রযুক্তি নয়—বরং এমন এক সহচর, যে সবসময়ই ‘শুনতে’ প্রস্তুত।

তার কাছে সুবিধাটা ছিল সহজ। ডাক্তার দেখাতে সময় পাওয়া কঠিন, আবার ইন্টারনেটে সার্চ করলে ভয়ংকর সব রোগের কথা উঠে আসে। কিন্তু এআই? সে নাকি মাঝামাঝি একটা ব্যালান্স করে উত্তর দেয়—এমনটাই মনে হতো অ্যাবির।

একবার তিনি যখন ইউরিন ইনফেকশনের মতো উপসর্গ অনুভব করেন, চ্যাটজিপিটি তাকে শান্তভাবে ফার্মাসিস্টের কাছে যেতে বলে।

পরে তিনি ওষুধ পান। সেই অভিজ্ঞতা তার কাছে ছিল প্রায় স্বস্তির মতো—যেন প্রযুক্তি তাকে ঠিক পথ দেখিয়ে দিল।

কিন্তু সব গল্পের মতোই, এখানেও মোড় আসে।

জানুয়ারির একদিন হাইকিং করতে গিয়ে তিনি পিছলে পড়ে যান। পিঠে তীব্র ব্যথা শুরু হয়, ব্যথা এতটাই যে পেট পর্যন্ত ছড়িয়ে যাচ্ছিল। স্বাভাবিকভাবেই তিনি আবার যান এআই-এর কাছে।

কিন্তু এবার উত্তরটা ছিল ভয় ধরানো। চ্যাটজিপিটি জানায়, তার কোনো অভ্যন্তরীণ অঙ্গ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে এবং দ্রুত হাসপাতালে যেতে হবে।

এই পরামর্শে আতঙ্কিত হয়ে তিনি জরুরি বিভাগে ছুটে যান।

কিন্তু ঘণ্টা তিনেক পর দেখা যায়, তার অবস্থা এতটা গুরুতর ছিল না—ব্যথা ধীরে ধীরে কমে আসে। তখনই বোঝা যায়, এআই এবার ভুল অনুমান করেছে।

এই ঘটনাটাই প্রশ্ন তুলে দেয়—এআই কি সত্যিই স্বাস্থ্য পরামর্শ দেওয়ার মতো নিরাপদ?

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিষয়টা একদম সোজা নয়।

ইংল্যান্ডের শীর্ষ চিকিৎসক স্যার ক্রিস হুইটি সতর্ক করে বলেছেন, এআই অনেক সময় আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে ভুল উত্তর দেয়—যা ব্যবহারকারীর জন্য বিপজ্জনক হতে পারে।

অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণায় দেখা গেছে, যখন এআইকে পুরোপুরি পরিষ্কার তথ্য দেওয়া হয়, তখন এটি বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সঠিক সিদ্ধান্ত দিতে পারে—প্রায় ৯৫% পর্যন্ত। কিন্তু বাস্তব জীবনের সমস্যা হচ্ছে, মানুষ কখনোই এভাবে নিখুঁতভাবে লক্ষণ বোঝাতে পারে না।

মানুষ সাধারণত খণ্ডিতভাবে কথা বলে—একটা উপসর্গ বাদ পড়ে যায়, কোনো তথ্য ভুলভাবে বোঝানো হয়, আবার কখনো ভয় বা উদ্বেগের কারণে বিষয়টা অতিরঞ্জিত হয়। আর ঠিক এই জায়গাতেই এআই বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে।

একটি পরীক্ষায় দেখা গেছে, যখন মানুষ ও এআই একসাথে স্বাস্থ্য সংক্রান্ত কথোপকথন করেছে, তখন সঠিক সিদ্ধান্তের হার নেমে এসেছে প্রায় ৩৫%-এ। অর্থাৎ বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ভুল বোঝাবুঝি তৈরি হয়েছে।

গবেষকদের ভাষায়, এআই তখনই ভালো কাজ করে যখন তাকে ‘পরিষ্কার কেস স্টাডি’ দেওয়া হয়। কিন্তু বাস্তব জীবন কখনোই ততটা পরিষ্কার নয়।

OpenAI এবং অন্যান্য এআই প্রতিষ্ঠান বলছে, তারা চিকিৎসকদের সাথে কাজ করে মডেল উন্নত করছে এবং স্বাস্থ্য সংক্রান্ত উত্তর আরো নিরাপদ করার চেষ্টা চলছে। তবে তারা এটাও স্পষ্ট করে জানাচ্ছে—এআই কোনোভাবেই ডাক্তার বা পেশাদার চিকিৎসা পরামর্শের বিকল্প নয়, বরং শুধুমাত্র তথ্য ও শিক্ষার জন্য ব্যবহার করা উচিত।

অ্যাবি এখনো এআই ব্যবহার করেন, কিন্তু তার দৃষ্টিভঙ্গি বদলে গেছে।এখন সে আরো সতর্ক। তিনি বলেন, আমি আর কোনো কথাই পুরোপুরি সত্য বলে ধরে নিই না। সবকিছুই একটু যাচাই করে দেখি।

সব মিলিয়ে, এআই স্বাস্থ্য পরামর্শ সহায়ক হতে পারে—বিশেষ করে প্রাথমিক ধারণা বা দিকনির্দেশনার ক্ষেত্রে। কিন্তু এটি কখনোই পেশাদার চিকিৎসকের বিকল্প নয়, আর অন্ধভাবে বিশ্বাস করাও ঝুঁকিপূর্ণ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *