রোজা রাখার পর ইফতারের আনন্দের মাঝেই অনেকের মাথাব্যথা হয়। সারাদিন না খেয়ে থাকার পর খাবার মুখে দিতে না দিতেই মাথা যেন ভারী হয়ে ওঠে।
এই ব্যথা অনেকের কাছেই পরিচিত একটা ঝামেলা। কখনও কপালে টনটন করে, কখনও মাথার পেছনে চাপ অনুভূত হয়, আবার কারও কারও চোখের ওপর দিয়ে ব্যথা ছড়িয়ে পড়ে।
বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক চিকিৎসক ডা. আফসানা হক নয়ন বলেন, “একে বলা হয় ‘ফাস্টিং হেডেক’ বা উপবাসজনিত মাথাব্যথা। এটি সাধারণত মৃদু থেকে মাঝারি ধরনের হয় এবং মূলত কপালে অনুভূত হয়।”
ভালো খবর হল, খাবার খাওয়ার পর সাধারণত ৭২ ঘণ্টার মধ্যে এই ব্যথা সেরে যায়। তবে সঠিক কারণ জেনে কিছু সতর্কতা অবলম্বন করলে এটি অনেকাংশে এড়ানো যায়।
ইফতারের পর মাথাব্যথার সবচেয়ে বড় কারণ পানিশূন্যতা। সারাদিন রোজা রাখার পর শরীরে পানির ঘাটতি তৈরি হয়। অনেকে মনে করেন ইফতারে প্রচুর পানি গ্রহণ করলেই হবে। আসলে দিনভর পানির অভাব মাথার রক্তনালী সংকুচিত করে ব্যথা তৈরি করে।
দ্বিতীয় কারণ- ক্যাফিন ছাড়ার ঝামেলা। যারা নিয়মিত চা-কফি পান করেন, তারা রোজার সময় ক্যাফিন না পেলে মাথাব্যথায় ভুগতে পারেন। সাধারণত শেষবার ক্যাফিন নেওয়ার ১৮ ঘণ্টা পর এই ব্যথা শুরু হয়।
তৃতীয় কারণ রক্তে শর্করার স্বল্পতা। দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকলে রক্তে গ্লুকোজ কমে যায়, যা মস্তিষ্কের ব্যথানুবর্তী ‘রিসেপ্টর’গুলোকে উত্তেজিত করে। যাদের আগে থেকে মাইগ্রেইনের সমস্যা আছে, তাদের ক্ষেত্রে রোজা এই ব্যথাকে আরও তীব্র করে তুলতে পারে।
ইফতারের পর মাথাব্যথার লক্ষণগুলো বোঝা জরুরি। এই ব্যথা সাধারণত মৃদু থেকে মাঝারি হয় এবং কপালে বা মাথার দুপাশে অনুভূত হয়।
মাইগ্রেইনের মতো দপদপ করে না। তবে যাদের মাইগ্রেইন আছে, তাদের ক্ষেত্রে রোজা ট্রিগার হিসেবে কাজ করতে পারে।
ব্যথা যদি খুব তীব্র হয়, ঘাড় শক্ত হয়ে যায়, বমি হয়, বিভ্রান্তি দেখা দেয়, জ্বর হয় বা শরীরের কোনো অংশ অবশ হয়ে যায়— তাহলে দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে।
এগুলো সাধারণ ‘ফাস্টিং হেডেক’ নয়, অন্য কোনো জটিলতার লক্ষণ হতে পারে।
“মাথাব্যথা কমানোর সবচেয়ে কার্যকর উপায় পর্যাপ্ত পানি পান। ইফতার থেকে সেহরি পর্যন্ত অল্প অল্প করে পানি পান করতে হবে। একসঙ্গে অনেক পানি গ্রহণ করলে পেট ফুলে যেতে পারে”- পরামর্শ দেন ডা. নয়ন।
ক্যাফিন নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি। যারা নিয়মিত চা-কফি পান করেন, তারা রোজার সময় ধীরে ধীরে ক্যাফিনের মাত্রা কমিয়ে আনুন। এতে ‘উইথড্রয়াল হেডেক’ কম হয়।
সেহরিতে সুষম খাবার খেতে হবে। প্রোটিন (ডিম, দই, ডাল), জটিল শর্করা (ওটস, লাল চাল) ও সবজি রাখুন। এগুলো রক্তে শর্করা দীর্ঘক্ষণ স্থিতিশীল রাখে। ইফতারে অতিরিক্ত ভাজাপোড়া বা চিনিযুক্ত খাবার এড়িয়ে চলুন।
বিশ্রামও খুব জরুরি। রমজানে ঘুমের ছন্দ ঠিক রাখুন। সেহরির পর সকালে যতটা সম্ভব ঘুমান। দুপুরে ২০ থেকে ৩০ মিনিটের ‘পাওয়ার ন্যাপ’ নিতে পারলে ক্লান্তি কমে।
মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ করুন। হালকা ব্যায়াম বা ধ্যান সাহায্য করে। যাদের মাইগ্রেইন আছে, তারা রোজার আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে প্রতিরোধমূলক ওষুধ ব্যবহার করতে পারেন।
রমজানে মাথাব্যথা সাধারণ একটা সমস্যা। তবে সঠিক সতর্কতা অবলম্বন করলে এটি অনেকটা নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়।
