দৃষ্টিহীনকে আলো দেখাবে ‘লিকুইড কর্নিয়া’

বয়সকালে চোখে চশমা এঁটেও বইয়ের পাতা খুটে খুটে অক্ষর পড়তে নাকানিচুবানি খেতে হয়। আর যাদের দৃষ্টিই চলে গেছে, তাদের সামনে গোটা পৃথিবীই অন্ধকার। এতদিন দৃষ্টিহীনের দৃষ্টি ফেরাতে চোখ প্রতিস্থাপন করা হতো। কিন্তু তাতে ঝুঁকি যেমন বিস্তর থাকে, ঠিক তেমনই ব্যর্থ হওয়ার আশঙ্কাও প্রবল থাকে। এমন অস্ত্রোপচারের পরও যে স্বচ্ছ দৃষ্টি ফিরে আসবে, তা না-ও হতে পারে।

কিন্তু লিকুইড কর্নিয়া সেই অসম্ভবকে সম্ভব করতে পারে। চক্ষু প্রতিস্থাপনের ঝুঁকি কমবে। দৃষ্টি ফিরবে দৃষ্টিহীনের। চোখের চিকিৎসার এক নতুন দিগন্ত খুলে দিতে পারে ‘লিকুইড কর্নিয়া’। বিষয়টি নতুন কিন্তু কার্যকারিতা নিয়ে নিশ্চিত দেশের বিজ্ঞানীরা।

লিকুইড কর্নিয়া হচ্ছে এক ধরনের বায়ো-পলিমার। এটি তৈরি করা হয়েছে হাইড্রোজেল দিয়ে। এতে থাকবে কোলাজেন, ফাইব্রিনোজোন ও স্টেম কোষ, যা নতুন কোষ তৈরির ক্ষমতা রাখে। এই হাইড্রোজেল ইনজেকশনের মাধ্যমে চোখে দেওয়া হবে। সেটি ঠিক কর্নিয়ার জায়গায় গিয়ে নতুন করে কোষ তৈরির কাজ শুরু করবে। আর এটি ধীরে ধীরে আসল কর্নিয়ার মতো গঠন তৈরি করবে। এ বিষয়ে গবেষকরা দাবি করেছেন— হাইড্রোজেল দিয়ে তৈরি কর্নিয়া অবিকল আসল কর্নিয়ার মতোই আচরণ করবে। এর মধ্য দিয়ে আলোকরশ্মি চোখে প্রবেশ করবে ও প্রতিফলন ঘটিয়ে দৃষ্টি ফিরিয়ে দেবে দৃষ্টিহীনের।

লিকুইড কর্নিয়া তাদের ক্ষেত্রেই প্রয়োগ করা যাবে, যাদের কর্নিয়া অস্বচ্ছ হয়েছে, কর্নিয়ার কোনো স্তর আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছে কিংবা কর্নিয়াল আলসারের কারণে দৃষ্টিশক্তি ঝাপসা হয়েছে বা চলে গেছে। অনেক সময়ে কর্নিয়ায় সংক্রমণের কারণেও দৃষ্টি ঝাপসা হয়। সংক্রমণ সেরে গেলেও তার দাগ থেকে যায়। অস্বচ্ছতার শুরু সেখানেই। যেহেতু কর্নিয়ার ঠিক মাঝখানের অংশ দিয়ে দেখা হয়, তাই সেই স্থানটি অস্বচ্ছ হয়ে উঠলে অন্ধত্ব অনিবার্য। জন্মগতভাবেও কর্নিয়ার অস্বচ্ছতা থাকতে পারে। সে ক্ষেত্রে লিকুইড কর্নিয়ার প্রয়োগ করা যেতে পারে। তবে গবেষকরা জানিয়েছেন, কোন রোগীর ক্ষেত্রে তা প্রয়োগ করা যাবে, আর কোন ক্ষেত্রে যাবে না, তা চিকিৎসকই ঠিক করতে পারবেন।

চক্ষু প্রতিস্থাপন আদতে কর্নিয়া প্রতিস্থাপন। চোখের আর কোনো অংশ প্রতিস্থাপন সম্ভব নয়। চোখের সামনের স্বচ্ছ অংশকে বলে কর্নিয়া। এর মধ্য দিয়েই আলোকরশ্মি চোখের ভেতরে ঢোকে ও রেটিনায় গিয়ে কেন্দ্রীভূত হয়। কর্নিয়ার কারণেই দৃষ্টি আসে, চোখের সামনের দৃশ্য স্পষ্ট দেখা যায়। কোনো কারণে কর্নিয়া যদি ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তাহলে চোখের সামনে অন্ধকার নেমে আসবে। দৃষ্টি ঝাপসা হতে হতে চলেও যেতে পারে। কর্নিয়া প্রতিস্থাপনই তখন আরোগ্য লাভের একমাত্র উপায় হয়ে উঠতে পারে।

তবে এই কর্নিয়া প্রতিস্থাপন খুব একটা সহজ নয়। কারণ সদ্য মৃত দাতার থেকে কর্নিয়া তোলা ও সেটি নিপুণভাবে গ্রহীতার চোখে বসিয়ে দেওয়ার কাজটি বড়ই জটিল ও সময়সাপেক্ষ। পেঁয়াজের খোসার মতো অনেকগুলো স্তর থাকে কর্নিয়ায়। মৃতের চোখ থেকে তা নিখুঁতভাবে তুলে ফেলতে হয়। কোনো একটি স্তরও যদি আঘাত পায়, তাহলে প্রতিস্থাপন ঠিকমতো হবে না। তাই প্রক্রিয়াটি জটিল। ঝুঁকিপূর্ণও বটে। বেঙ্গালুরুর একটি গবেষণা সংস্থা কর্নিয়া প্রতিস্থাপনের ঝুঁকি কমাতে লিকুইড কর্নিয়া তৈরি করে ফেলেছে। গবেষণাগারে তৈরি এক উপাদান, যা চোখে ইনজেক্ট করলে সেটি কর্নিয়ার মতোই চোখের কোষ তৈরি করতে শুরু করবে। অর্থাৎ প্রতিস্থাপন না করে কর্নিয়া নতুন করে চোখের ভেতরেই তৈরি করা যাবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *