ফুসফুসের ক্যান্সার নিয়ে মানুষের মধ্যে নানা ভুল ধারণা আছে। অনেকেই মনে করেন, এটি শুধু ধূমপায়ীদের রোগ। আবার কেউ কেউ ভাবেন, আগে থেকে এই ক্যান্সার ধরা যায় না। তবে বাস্তবে এসব ধারণা পুরোপুরি ঠিক নয়।
ফুসফুসে অস্বাভাবিক কোষ নিয়ন্ত্রণহীনভাবে বাড়তে থাকলে ক্যান্সার তৈরি হয়। এতে টিউমার গড়ে ওঠে। ফুসফুস ঠিকভাবে কাজ করতে পারে না। শরীরে অক্সিজেন নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
চিকিৎসা না করা হলে এটি শরীরের অন্য অংশেও ছড়িয়ে যেতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিভিন্ন ভুল ধারণার কারণে অনেকেই দেরিতে চিকিৎসা নেন। এতে ঝুঁকি আরো বাড়ে।
ব্যানার এমডি অ্যান্ডারসন ক্যান্সার সেন্টারের থোরাসিক সার্জন ডা. ব্রেট ব্রুসার্ড ফুসফুসের ক্যানসার নিয়ে প্রচলিত ভ্রান্ত ধারণাগুলো ভেঙে বাস্তব তথ্য তুলে ধরেছেন।
ভুল ধারণা ১ : শুধু ধূমপায়ীদেরই ফুসফুসের ক্যান্সার হয়
ডা. ব্রেট ব্রুসার্ড বলেন, ধূমপান সবচেয়ে বড় ঝুঁকি—এটা সত্য। তবে শুধু ধূমপায়ীরাই আক্রান্ত হন—এই ধারণা ভুল।
ধূমপান না করা মানুষেরও এই রোগ হতে পারে। নতুন রোগীদের মধ্যে প্রায় ১০ থেকে ২০ শতাংশ এমন মানুষ, যারা কখনোই ধূমপান করেননি।
এ ছাড়া আরো নানা কারণে এই রোগের ঝুঁকি বাড়ে।
যেমন : অন্যের সিগারেটের ধোঁয়া, বাড়িতে রেডন গ্যাস, কর্মস্থলের ক্ষতিকর রাসায়নিক, বায়ুদূষণ, পারিবারিক ইতিহাস, এইচআইভি সংক্রমণ ও বিকিরণ। বিশেষ করে দীর্ঘদিন অন্যের সিগারেটের ধোঁয়ার মধ্যে থাকলেও ঝুঁকি ২০ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে।
ভুল ধারণা ২ : ফুসফুসের ক্যান্সার মানেই মৃত্যু
একসময় এই ক্যান্সারের চিকিৎসা কঠিন ছিল। তাই এখনো অনেকের মধ্যে ভয় কাজ করে। তবে বর্তমানে চিকিৎসায় অনেক উন্নতি হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুরুতেই ধরা পড়লে শুধু অপারেশন করেই ৬০ থেকে ৯০ শতাংশ রোগী সুস্থ হতে পারেন। এখন চিকিৎসায় যুক্ত হয়েছে নতুন নতুন পদ্ধতি। যেমন : লক্ষ্যভিত্তিক রেডিয়েশন, ইমিউনোথেরাপি, রোবটিক সার্জারি ও ব্যক্তিভিত্তিক চিকিৎসা।
ডা. ব্রুসার্ড বলেন, অনেক ক্ষেত্রে টিউমারের জিন পরীক্ষা করে সরাসরি ক্যান্সারকে লক্ষ্য করে চিকিৎসা দেওয়া যায়। এতে সব সময় কেমোথেরাপির প্রয়োজন হয় না।
ভুল ধারণা ৩ : শুরুতেই লক্ষণ দেখা যায়
ফুসফুসের ক্যান্সার শুরুতে অনেক সময় কোনো লক্ষণ দেখায় না। ফলে রোগীরা বিষয়টি বুঝতেই পারেন না। বিশেষজ্ঞদের মতে, ক্যান্সার বড় হলে বা ছড়িয়ে পড়লে লক্ষণ দেখা দেয়।
লক্ষণগুলো অনেক সময় সাধারণ ঠাণ্ডা-কাশির মতো মনে হতে পারে। দীর্ঘদিন কাশি, শ্বাসকষ্ট, বুকে ব্যথা, কাশির সঙ্গে রক্ত, অস্বাভাবিক ক্লান্তি, হঠাৎ ওজন কমে যাওয়া, কণ্ঠস্বর বদলে যাওয়া, বারবার নিউমোনিয়া বা ব্রংকাইটিসের মতো লক্ষণ দেখা দিতে পারে।
ভুল ধারণা ৪ : সব ফুসফুসের ক্যান্সার একই
এই ক্যান্সারের ধরন সব সময় এক রকম নয়। তাই চিকিৎসাও নির্ভর করে এর ধরন ও আচরণের ওপর। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রধানত দুই ধরনের ফুসফুসের ক্যান্সার বেশি দেখা যায়।
নন-স্মল সেল লাং ক্যান্সার : এটি ৮০ থেকে ৮৫ শতাংশ ক্ষেত্রে দেখা যায়। এটি তুলনামূলক ধীরগতিতে বৃদ্ধি পায়।
অন্যটি স্মল সেল লাং ক্যান্সার : এটি দ্রুত বৃদ্ধি পায় এবং দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। ধূমপানের সঙ্গে এর সম্পর্ক বেশি।
ভুল ধারণা ৫ : স্ক্রিনিং করলে ক্যান্সার হয়
কম ডোজের সিটি স্ক্যানের মাধ্যমে ফুসফুসের ক্যান্সার আগেভাগে ধরা সম্ভব। এই পরীক্ষায় খুব কম রেডিয়েশন লাগে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এতে ছোট টিউমারও ধরা পড়ে। ফলে দ্রুত চিকিৎসা শুরু করা যায়।
যাদের বয়স ৫০ থেকে ৮০ বছর এবং দীর্ঘদিন ধূমপানের ইতিহাস আছে, তাদের নিয়মিত স্ক্রিনিং করা উচিত।
ভুল ধারণা ৬ : তরুণদের এই ক্যান্সার হয় না
অনেকে মনে করেন, এটি শুধু বয়স্কদের রোগ। তবে বাস্তবে যেকোনো বয়সেই ফুসফুসের ক্যান্সার হতে পারে। তরুণদের ক্ষেত্রে অনেক সময় জিনগত কারণ ভূমিকা রাখে। ধূমপানের সঙ্গে সম্পর্ক না-ও থাকতে পারে।
ভুল ধারণা ৭ : সব রোগীর চিকিৎসা এক রকম
একেক জন রোগীর চিকিৎসা একেক রকম হয়। রোগের স্তর ও শারীরিক অবস্থার ওপর ভিত্তি করে চিকিৎসা নির্ধারণ করা হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু ক্যান্সারের স্তর নয়, পুরো শারীরিক অবস্থা বিবেচনায় নেওয়া জরুরি। চিকিৎসায় অপারেশন, রেডিয়েশন ও কেমোথেরাপি এককভাবে বা একসঙ্গে ব্যবহার করা হয়।
ভুল ধারণা ৮ : ঝুঁকি কমানোর কোনো উপায় নেই
ফুসফুসের ক্যান্সারের ঝুঁকি পুরোপুরি এড়ানো না গেলেও কিছু অভ্যাসে তা কমানো যায়। যেমন : ধূমপান না করা বা ছেড়ে দেওয়া, অন্যের ধোঁয়া এড়িয়ে চলা, বাড়িতে রেডন পরীক্ষা করা, কর্মস্থলে সুরক্ষা ব্যবহার এবং নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা।
ভুল ধারণা মানুষকে বিভ্রান্ত করে। এতে রোগ ধরতে দেরি হয়ে যায়। ফলে চিকিৎসার সুযোগও কমে যায়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সঠিক তথ্য জানা জরুরি। লক্ষণ দেখা দিলে দেরি না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। নিয়মিত পরীক্ষা অনেক ক্ষেত্রেই জীবন বাঁচাতে পারে।
