গ্রীষ্মকাল মানেই তীব্র রোদ। গরম হাওয়া ও ঘামের কারণে খুব কষ্ট হয়। বাংলাদেশের মতো উষ্ণ দেশের ক্ষেত্রে সাধারণত মার্চ মাসের মাঝামাঝি থেকে সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি পর্যন্ত গরম থাকে। এই সময়ে অনেক রোগ দ্রুত ছড়ায়।
গরমে শরীরের আর্দ্রতা কমে যায়। শরীর শুকিয়ে যায়। শক্তি দ্রুত কমে। রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাও কমে যায়।
গরমে পানিশূন্যতা একটা বড় সমস্যা। তীব্র গরমে মানুষ ঘণ্টায় ২ থেকে ৩ লিটার পর্যন্ত ঘামতে পারে। তাই বেশি করে পানি পান করা খুব জরুরি। ডাবের পানি, লেবুর শরবত, আখের রস—এগুলো ভালো গ্রীষ্মকালীন পানীয়।
এ সময় খাবার ও কাজ এমন হওয়া উচিত, যা গরমের প্রভাব কমায়। তাই ঠাণ্ডা ও তরল খাবার খাওয়া উচিত। এমন খাবার শরীরের হারানো আর্দ্রতা ফিরিয়ে আনে।
তরমুজ, আম, আখ, খেজুর, আঙুর, কমলার মত রসালো ফল শরীরের ভারসাম্য রাখতে সাহায্য করে।
গরমে নানা ধরনের পানীয়ও তৈরি করা হয়। যেমন- আম পানা, লাচ্ছি, বিভিন্ন শরবত।
গরমে ঘামাচি, চামড়ায় ফুসকুড়ি ইত্যাদি সমস্যা দেখা দেয়। ঠাণ্ডা পানি দিয়ে গোসল করলে আরাম পাওয়া যায়। ত্বকে চন্দন মাখলেও উপকার হয়।
ভুল খাবার ও অভ্যাসের কারণে হজমের সমস্যা হয়। শরীর দুর্বল হয়ে পড়ে। পরে ডায়রিয়া বা পেটের সংক্রমণ হতে পারে। তাই হালকা, কম মসলা, কম তেলযুক্ত ও বেশি তরল খাবার খাওয়া ভালো। অতিরিক্ত ঝাল, নোনতা ও টক খাবার এড়াতে হবে।
গরমে তিন ধরনের সমস্যা হতে পারে। হিট ক্র্যাম্প, হিট এক্সহস্টশন ও হিট স্ট্রোক। হিট ক্র্যাম্প সবচেয়ে কম গুরুতর, তবে এটি বড় বিপদের ইঙ্গিত দেয়।
হিট ক্র্যাম্পের লক্ষণ হলো—হৃদস্পন্দন বেড়ে যাওয়া, মাথা ঘোরা, দুর্বল লাগা, বেশি ক্লান্তিবোধ, গরম বা ঘামযুক্ত ত্বক, মুখ লাল হয়ে যাওয়া। পরে বমি বমি ভাব বা বমি হওয়া।
হিট এক্সহস্টশনেও একই ধরনের লক্ষণ থাকে। তবে এতে শরীরের তাপমাত্রা বাড়ে। কখনও জ্বরও আসে।
হিট স্ট্রোক সবচেয়ে গুরুতর। উপযুক্তও চিকিৎসা না হলে মস্তিষ্কের বড় ক্ষতি হতে পারে। এর লক্ষণ হলো- শুকনো ত্বক ও মুখ, মাথা ব্যথা, বিভ্রান্তি, শ্বাস নিতে কষ্ট, অজ্ঞান হয়ে যাওয়া, মস্তিষ্কে রক্ত চলাচলে সমস্যা ও চরম দুর্বলতা।
কারও যদি হিট এক্সহস্টশন বা হিট স্ট্রোক হয়, তাহলে দ্রুত চিকিৎসা নিতে হবে। তাকে গরম থেকে দূরে সরাতে হবে। বাড়তি কাপড় খুলে দিতে হবে। আঁটসাঁট কাপড় ঢিলা করতে হবে। পা উঁচু করে শুইয়ে রাখতে হবে। বাতাস করতে হবে। ত্বক অতিরিক্ত শুকনো হলে ভেজা কাপড় দিয়ে মুছতে হবে।
এসব থেকে বাঁচতে যা করতে পারেন-
বেশি পানি পান করতে হবে। ঘামের কারণে শরীর থেকে প্রচুর পানি বের হয়ে যায়। মনে রাখতে হবে, পিপাসা লাগা মানে শরীর ইতিমধ্যে প্রায় ১৫ শতাংশ পানিশূন্য হয়ে পড়েছে।
দিনে কিছুক্ষণ ঘুমানো যেতে পারে। কারণ গ্রীষ্মকালে দিন বড় হয়, রাত ছোট হয়।
হালকা রঙের পাতলা সুতির কাপড় পরতে পারেন। এতে শরীর ঠাণ্ডা থাকে, ত্বক বাতাস পায় ও ঘাম সহজে শুকায়।
বাইরে গেলে ধীরে ধীরে হাঁটতে হবে। ধীরে ধীরে গরমের সঙ্গে শরীরকে মানিয়ে নিতে দিন।
শরীরে হালকা সুগন্ধি ব্যবহার করলে স্বস্তিবোধ হয়।
গলার পেছনে ভেজা কাপড় রাখতে পারেন।
দিনে যতটা সম্ভব ঘরের ভেতরে থাকতে পারেন।
ছাতা বা টুপি ব্যবহার করতে পারেন। কাপড় দিয়ে মাথা ঢাকুন।
বারবার পানি বা উপযুক্ত পানীয় পান করুন।
যা করবেন না-
অ্যালকোহলযুক্ত পানীয়, কফি বা সফট ড্রিংকস এড়িয়ে চলুন। এগুলো তাৎক্ষণিক আরাম দিলেও শরীর থেকে পানি বের করে দেয়।
অতিরিক্ত লবণ বা ইলেক্ট্রোলাইট নেওয়ার দরকার নেই। কারণ সাধারণ খাবারেই এগুলো প্রয়োজনীয় পরিমাণে থাকে।
প্রতি ২-৩ ঘণ্টায় প্রস্রাবের পরিমাণ ও রং লক্ষ্য করুন। পরিমাণ কমবেশি ৩০০-৫০০ মিলি হওয়া উচিত। রং হালকা হলুদ হওয়া ভালো। গাঢ় হলুদ বা কমলা রঙের প্রস্রাব হলে বুঝতে হবে শরীরে পানি কমে গেছে।
অসুস্থ লাগলে দ্রুত চিকিৎসা নিন।
সিনথেটিক কাপড় পরবেন না। এতে ত্বক বাতাস পায় না এবং গরম বেশি লাগে।
অত্যন্ত গরম ও আর্দ্র আবহাওয়ায় কাজ কম করুন।
সরাসরি রোদে যাবেন না।
কঠিন শারীরিক পরিশ্রম এড়িয়ে চলুন।
শিশু বা পোষা প্রাণীকে রোদে বা বন্ধ গাড়িতে রাখবেন না।
অতিরিক্ত গরমে কফি বা অ্যালকোহল পান করবেন না।
গাঢ় রঙ, ভারী বা আঁটসাঁট কাপড় পরবেন না।
অতিরিক্ত গরমের সময় রান্না এড়িয়ে চলুন। রান্না করলে দরজা-জানালা খুলে রাখুন।
ঝাল, নোনতা ও টক খাবার কম খান। এগুলো শরীরে গরম বাড়ায়।
এক বছরের কম বয়সী শিশুকে মধু দেবেন না।
এই গ্রীষ্মে নিরাপদ থাকুন।
