তীব্র দাবদাহে পুরুষদের তুলনায় কেন বেশি স্বাস্থ্যঝুঁকিতে নারীরা?

বিশ্বজুড়ে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে দাবদাহ বা হিটওয়েভ দীর্ঘস্থায়ী এবং আরও তীব্র হয়ে উঠছে। তবে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, তীব্র গরমের এই প্রকোপ পুরুষ ও নারীর ওপর সমানভাবে প্রভাব ফেলে না। জৈবিক, হরমোনজনিত এবং সামাজিক বিভিন্ন কারণে তীব্র গরমে পুরুষদের তুলনায় নারীরা অনেক বেশি ঝুঁকিতে থাকেন।

চিকিৎসা বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘ সময় ধরে অতিরিক্ত তাপমাত্রার সংস্পর্শে থাকা নারীদের শরীরে মারাত্মক চাপ সৃষ্টি করে। এর ফলে মাথা ঘোরা, অতিরিক্ত ক্লান্তি, উদ্বেগ, হাত-পা ফুলে যাওয়া, অনিদ্রা, মনোযোগের অভাব এবং হিটস্ট্রোকের মতো গুরুতর তাপজনিত অসুস্থতার ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। 

যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিসের নারী স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ড. নিঘাত আরিফ তীব্র দাবদাহকে হৃদযন্ত্র ও রক্তনালী ব্যবস্থার (কার্ডিওভাসকুলার সিস্টেম) জন্য একটি ‘স্ট্রেস টেস্ট’ বা কঠিন পরীক্ষা হিসেবে বর্ণনা করেছেন। কারণ এই চরম আবহাওয়ায় শরীরের তাপমাত্রা স্বাভাবিক রাখতে হৃদযন্ত্রকে সাধারণ সময়ের চেয়ে অনেক বেশি পরিশ্রম করতে হয়।

নারীরা কেন গরমে বেশি আক্রান্ত হন?

বিশেষজ্ঞদের মতে, পুরুষদের তুলনায় নারীদের শরীর থেকে সাধারণত কম ঘাম নির্গত হয় এবং অপেক্ষাকৃত বেশি তাপমাত্রায় পৌঁছানোর পর তাদের শরীর ঘামানো শুরু করে। এর ফলে নারীদের শরীর প্রাকৃতিকভাবে নিজেকে দ্রুত ঠান্ডা করতে পারে না।

তাছাড়া, নারীদের শরীরে চর্বির (বডি ফ্যাট) হার তুলনামূলকভাবে বেশি থাকে এবং শরীরের অভ্যন্তরীণ গড় তাপমাত্রা সামান্য বেশি থাকে। অতিরিক্ত চর্বি শরীরের তাপকে দীর্ঘক্ষণ ধরে রাখতে কুশন বা অন্তারক (ইনসুলেশন) হিসেবে কাজ করে। 

হরমোনের ওঠানামাও শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ প্রক্রিয়াকে আরও জটিল করে তোলে। ঋতুস্রাব (পিরিয়ড), গর্ভাবস্থা, স্তন্যদান এবং মেনোপজের (স্থায়ীভাবে পিরিয়ড বন্ধ হওয়া) সময় শরীরে ইস্ট্রোজেন ও প্রজেস্টেরন হরমোনের পরিবর্তন নারীদের শরীরকে ঠান্ডা রাখার প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করে। 

চিকিৎসকরা বলছেন, ঋতুচক্রের বিভিন্ন ধাপ তীব্র গরমে শরীরের স্বাভাবিক কার্যক্ষমতাকে প্রভাবিত করে। পিরিয়ড শুরুর আগে প্রজেস্টেরন হরমোনের মাত্রা বৃদ্ধির কারণে শরীরের স্বাভাবিক তাপমাত্রা বেড়ে যায়। আবার পিরিয়ড চলাকালীন ইস্ট্রোজেনের মাত্রা কমে যাওয়ায় শরীর তাপ নিয়ন্ত্রণ করতে সমস্যায় পড়ে। 

পাশাপাশি পিরিয়ডের সময় অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের ফলে শরীর থেকে আয়রন কমে যায়। এটি গরমের দিনে অতিরিক্ত ক্লান্তি, মাথা ঘোরা, ঘুমের ব্যাঘাত এবং মনোযোগ দেওয়ার ক্ষমতা কমিয়ে দেয়। 

গর্ভাবস্থা ও মেনোপজে দ্বিগুণ ঝুঁকি

পেরিমেনোপজ বা মেনোপজের মধ্য দিয়ে যাওয়া নারীদের ক্ষেত্রে দাবদাহের সময় ‘হট ফ্ল্যাশ’ (হঠাৎ শরীর ও বুক গরম হয়ে ওঠা) এবং রাতে অতিরিক্ত ঘাম হওয়ার সমস্যা তীব্র হয়। গর্ভাবস্থাও হিট স্ট্রোক বা তাপজনিত অসুস্থতার ঝুঁকি অনেক বাড়িয়ে দেয়। 

খ্যাতনামা চিকিৎসা সাময়িকী ‘দ্য ল্যানসেট’-এ প্রকাশিত গবেষণা অনুযায়ী, গর্ভাবস্থায় নারীর শরীরের মেটাবলিজম, রক্তের পরিমাণ এবং তরলের চাহিদা বৃদ্ধি পায়, যা হৃদযন্ত্রের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে। অতিরিক্ত গরমে দীর্ঘ সময় থাকলে গর্ভবতী মা ও শিশু উভয়ের ক্ষেত্রেই জটিলতা তৈরি হতে পারে। 

সামাজিক ও জীবনযাত্রার প্রভাব

ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের ইনস্টিটিউট ফর গ্লোবাল হেলথ-এর ড. কেট পেনহাউ গোমেস জানান, নারীরা সাধারণত পরিবার ও সংসারের সেবামূলক কাজে বেশি জড়িয়ে থাকেন। ফলে দাবদাহের সময় নিজের স্বাস্থ্যের যত্ন নেওয়া তাদের পক্ষে কঠিন হয়ে পড়ে।

তাছাড়া, পুরুষদের তুলনায় নারীদের গড় আয়ু বেশি হওয়ায় বয়স্ক নারীদের একাংশ তীব্র গরমে বড় ঝুঁকিতে পড়েন। বার্ধক্য, ডিমেনশিয়া বা কিছু নির্দিষ্ট ওষুধের ব্যবহারের কারণে তৃষ্ণা পাওয়ার অনুভূতি কমে যায়, যা দ্রুত শরীরে পানিশূন্যতা তৈরি করে।

তাপজনিত অসুস্থতার সতর্ক সংকেত

অতিরিক্ত গরমে শরীর কাহিল হয়ে পড়লে (হিট এক্সহস্টিং) যে লক্ষণগুলো দেখা যায়:

  • মাথা ঘোরা বা হালকা লাগা
  • তীব্র শারীরিক দুর্বলতা
  • বমি বমি ভাব বা বমি হওয়া
  • পেশিতে টান লাগা (মাসল ক্র্যাম্প)
  • ত্বক ঠান্ডা ও স্যাঁতসেঁতে হয়ে যাওয়া
  • অজ্ঞান হয়ে যাওয়া

হিটস্ট্রোক একটি জরুরি চিকিৎসা পরিস্থিতি। এর লক্ষণগুলো হলো:

  • শরীরের তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের (১০৪ ডিগ্রি ফারেনহাইট) ওপরে চলে যাওয়া
  • শরীর অত্যন্ত গরম ও শুষ্ক হয়ে যাওয়া (কোনো ঘাম না হওয়া)
  • মানসিক বিভ্রান্তি বা অসংলগ্ন আচরণ
  • জ্ঞান হারানো বা খিঁচুনি হওয়া

সুরক্ষায় চিকিৎসকদের পরামর্শ

তীব্র গরমে নারীদের সুস্থ থাকতে সাধারণ কিছু নিয়ম মেনে চলার পরামর্শ দিয়েছেন চিকিৎসকরা:

১. সারাদিনে প্রচুর পরিমাণে পানি বা তরল খাবার পান করুন।

২. দুপুরের তীব্র রোদে ঘরের বাইরে কাজ করা থেকে বিরত থাকুন।

৩. শারীরিক ব্যায়াম বা হাঁটাচলার কাজটি খুব ভোরে অথবা সূর্যাস্তের পর করুন।

৪. হালকা রঙের ও ঢিলেঢালা পোশাক পরুন এবং বাইরে বের হলে সানস্ক্রিন ব্যবহার করুন। 

৫. পিরিয়ড, গর্ভাবস্থা বা মেনোপজের সময় শরীরে তরলের ভারসাম্য ঠিক রাখতে বাড়তি যত্ন নিন। 

বিশেষজ্ঞরা জোর দিয়ে বলেছেন, তীব্র দাবদাহের মোকাবিলায় কর্মক্ষেত্র ও সরকারি নীতিমালায় নারীদের বিশেষ স্বাস্থ্য চাহিদাকে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত। কারণ নারীদের সুরক্ষিত রাখা মানে প্রকারান্তরে পুরো পরিবার ও সমাজকেই সুরক্ষিত রাখা। 

সূত্র: সামা টিভি 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *